skip to Main Content

ফিচার I রহস্য রোমান্স

আধো অনাবৃত আর আধো অবগুণ্ঠনের ইন্দ্রজালে রোমান্টিক আবহের রেশ ছড়িয়ে দিতে কিছু ফ্যাব্রিক পালন করে জাদুকরের ভূমিকা। পরিধানকারীর ব্যক্তিত্বে মর্যাদাহানি ঘটাতে নয়; বরং বাড়তি আভা যুক্ত করার উদ্দেশে

রোমান্টিক ফ্যাব্রিকের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক এর মায়াবি আবহ। এই মায়াময়তা কখনো স্বচ্ছতায়, কখনো অর্ধস্বচ্ছতায়। নেট বা টিউলের ভেতর দিয়ে দেখা যায় ত্বকের আভাস। পুরোটা নয়, আবার গোপনও নয়। এই ইঙ্গিতের সৌন্দর্যই রোমান্টিক ফ্যাব্রিককে আলাদা করে তোলে। লেইসের ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দেওয়া ত্বক, অরগ্যাঞ্জার নিচে লুকানো সিলুয়েট—সবই কল্পনার জায়গা তৈরি করে। ফ্যাশনে মায়া আবহ সৃষ্টি মানে অশ্লীলতা নয়; বরং সংযত আকর্ষণ। এই পরিমিতিবোধই রুচির পরিচয়। রোমান্টিক ফ্যাব্রিকের আকর্ষণ আন্দোলিত করে অনুভূতি। শিফনের পোশাক যখন পায়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দোল খায়, স্যাটিন স্লিপ ড্রেস যখন আলোয় উদ্ভাসিত হয়, সেই মুহূর্তে আকর্ষণীয় আবেদন তৈরি হয়। এই আবেদন কখনো চটকদার নয়; বরং ধীরে ধীরে মনোযোগ কেড়ে নেয়। তাই এসব কাপড় পরলে শুধু সৌন্দর্য নয়; বরং মোহনীয় ও কমনীয় বার্তাও পায় প্রকাশ।
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ফ্যাশন হাউসগুলোতেও দেখা যায় এমন ফ্যাব্রিকের ব্যবহার। ডিওর, শ্যানেল, ভ্যালেন্তিনো, ডলশে অ্যান্ড গ্যাবানা, লা পারলা, ভিক্টোরিয়া’স সিক্রেট—সবাই রোমান্টিক ফ্যাব্রিককে তাদের ডিজাইনের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছে সূচনালগ্ন থেকে। ডিওরের লেস মডার্ন ফেমিনিনিটির উদ্ভাসন, ভ্যালেন্তিনোর শিফন ও সিল্ক কাব্যিক প্রেম, ডলশে অ্যান্ড গ্যাবানার কালো লেস মানে সাহসী রোমান্সের প্রকাশ, লা পারলার লেস ও স্যাটিন লঞ্জারিতে নারীর শরীর যেন শিল্পে রূপ নেয়। এই ব্র্যান্ডগুলোর কর্তাব্যক্তিরা ভালোই জানেন, রোমান্স কখনো ট্রেন্ডের বাইরে যায় না; শুধু তার প্রকাশভঙ্গি বদলায়। আর সেখানে রোমান্টিক ফ্যাব্রিকের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যবহার দেখা যায় অন্তর্বাসে। কারণ, এখানে ফ্যাশন জনসমক্ষের নয়; একান্ত ব্যক্তিগত। লেইস ব্রা, স্যাটিন ক্যামিসোল, সিল্ক নাইটড্রেস কিংবা নেট ডিটেইলড বডিস্যুট—এসব পোশাক অন্যের জন্য নয়; প্রথমত নিজের জন্য। এগুলো আত্মপ্রেমের অংশ। প্রিয় সঙ্গীর সান্নিধ্য কামনার অনুভূতিতে ধরা দেওয়ার। আর এখানেই আধুনিক লঞ্জারি ডিজাইনার ব্র্যান্ডগুলো বুঝেছে ক্রেতার চাহিদা। এই রেভল্যুশনারি ভাবনা থেকে ডিজাইনে এখন আর শুধু পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি নেই; আছে নারীর নিজের স্বাচ্ছন্দ্য ও আত্মবিশ্বাসও। নরম ফ্যাব্রিক, ব্রিদেবল বুনন, আর শরীরকে সম্মান করে এমন ডিজাইন—সব মিলিয়ে লঞ্জারি এখন শক্তির প্রতীক।
লেইস: সূক্ষ্মতার সাহস
লেইস মানে শুধু কোমলতা নয়; সংযত সাহসও। সূক্ষ্ম বুননের ফাঁকে ফাঁকে লুকিয়ে থাকে যেন ইউরোপীয় রাজকীয়তা, ভিক্টোরিয়ান লাজুকতা আর আধুনিক নারীর আত্মবিশ্বাস। ফুলেল বা জ্যামিতিক নকশায় তৈরি এই ফ্যাব্রিক ত্বক পুরোপুরি ঢাকে না; আবার প্রকাশও করে না। এই দ্বৈততার ভেতরে লেইসের রোমান্স লুকিয়ে। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো এর ব্যবহার করে ফেমিনিন পাওয়ারের প্রতীক হিসেবে।
নেট ও টিউল: স্বচ্ছতার কবিতা
নেট বা টিউল হলো স্বচ্ছতার শিল্প। জালের মতো বুনন, হালকা ওজন আর বাতাসে ভেসে চলার ক্ষমতা এই ফ্যাব্রিককে নারীদের কাছে করে তুলেছে স্বপ্নিল। নেট দিয়ে পুরো পোশাক তৈরি হয় কম; এটি মূলত পোশাককে আবেদনময় করে তোলে। নেটের কাজ সম্পূর্ণ প্রকাশ নয়; বরং ইঙ্গিত দেওয়া। আন্তর্জাতিক ফ্যাশনে টিউল মানেই ড্রামা ও রোমান্স। ডিওরের গাউন থেকে শুরু করে ভ্যালেন্তিনোর কতুর কালেকশন অবধি। লঞ্জারিতে নেট ব্যবহার করা হয় সেনসুয়াল লেয়ার হিসেবে; যেখানে শরীর দৃশ্যমান, কিন্তু অধরা।
শিফন: চলমান নারীত্ব
শিফন কখনো স্থির থাকে না। হাঁটার সঙ্গে সঙ্গে নড়ে, আলোয় রং বদলায়, বাতাসে দুলে ওঠে। এই চলমানতাই শিফনের রোমান্টিক শক্তি। এই কাপড় শরীরের ভাঁজকে আঁকড়ে ধরে না; যেন অনুসরণ করে। বিশ্বজুড়ে শিফন মানেই সফট এলিগ্যান্স। এলি শাব বা ভ্যালেন্তিনোর প্রোডাক্ট লাইনে তাই এটি প্রেমের গল্পের মতো। শিফনের নাইটড্রেস বা রোব মানে আরাম ও আবেগের মেলবন্ধন। যেখানে সুন্দরতা চাপিয়ে দেওয়া নয়; বরং স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত।
অরগ্যাঞ্জা: আবেদন আহ্বান
দেখতে স্বচ্ছ, কিন্তু চরিত্রে দৃঢ়। এর ক্রিস্প বুনন স্ট্রাকচারাল ডিজাইন তৈরি করে; কিন্তু ওজন রাখে হালকা। রোমান্টিক ফ্যাব্রিকের ভেতর অরগ্যাঞ্জা সবচেয়ে আর্কিটেকচারাল। আন্তর্জাতিক রানওয়েতে এর উপস্থিতি মানেই স্ট্রাকচার্ড রোমান্স। লঞ্জারিতে কম ব্যবহৃত হলেও ডিটেইল বা লেয়ার হিসেবে অরগ্যাঞ্জা নারীর শক্ত ও কোমল দিককে একসঙ্গে প্রকাশ করে। মডার্ন রোমান্টিক স্টেটমেন্ট হিসেবে আজকাল এর ব্যবহার জনপ্রিয় হচ্ছে।
সিল্ক: কোমল আভিজাত্য
এটি সেই ফ্যাব্রিক, যা ত্বকের সঙ্গে কথা বলে। মসৃণ, শীতল আবার উষ্ণ, অদ্ভুত এক প্রাকৃতিক বিলাসিতা সিল্ক। মূল্যবান ফ্যাব্রিক হওয়ায় এর কদর অভিজাত মহলে দারুণ। আরমানি, গুচি, লা পারলা এই ফ্যাব্রিকের ব্যবহার করে চিরন্তন এলিগ্যান্স বোঝাতে। লঞ্জারিতে সিল্ক স্লিপ ড্রেস বা নাইট গাউন নারীর ব্যক্তিগত রোমান্সের প্রতীক; নিজেকে মূল্যবান মন করিয়ে দেওয়া যেন।
স্যাটিন: মসৃণ কাব্য
স্যাটিনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য আলো ধরার সক্ষমতা। এই ফ্যাব্রিকের মসৃণ পৃষ্ঠে আলো প্রতিফলিত হয়। এটি দৃশ্যমান আকর্ষণ তৈরি করে এবং একই সঙ্গে ভীষণ কমনীয়। আন্তর্জাতিক লঞ্জারি ব্র্যান্ডগুলো স্যাটিনকে বেছে নেয় সেনসুয়াল কিন্তু পরিশীলিত বৈশিষ্ট্যের জন্য। ব্রালেট, ক্যামিসোল বা স্লিপ ড্রেসে স্যাটিন মানে আত্মবিশ্বাসী নারী—যিনি নিজেকে আড়াল করেন না, আবার পূর্ণরূপে প্রদর্শন করতেও নারাজ।
জর্জেট: সাইলেন্ট রোমান্স
এর হালকা খসখসে টেক্সচার আর সফট ড্রেপ একধরনের পরিমিত সৌন্দর্য তৈরি করে। খসখসে টেক্সচার হলেও মোটেই উগ্র নয়। রোমান্টিক কিন্তু নাটকীয় নন যারা, তারা ভীষণ পছন্দ করেন এই কাপড়। বিশ্ব ফ্যাশনে জর্জেট ব্যবহৃত হয় ডে-টু-ইভনিং এলিগ্যান্সে। লঞ্জারিতে জর্জেট মানে আরামদায়ক এবং সংযত আকর্ষণের প্রতীক, যেখানে সৌন্দর্য ব্যক্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ।
ভেলভেট: গভীর রোমান্স
এককথায় ভেলভেট হলো রাতের ফ্যাব্রিক। এর গভীর রং, নরম স্পর্শ আর ভারী উপস্থিতি একধরনের নাটকীয় প্রেম তৈরি করে। ভেলভেট আলো শোষণের মাধ্যমে একরকম রহস্য তৈরি করে রাতের আবহের সঙ্গে। যেন আলো-আঁধারের ঐকতান। ভারসাচি, ডলশে অ্যান্ড গ্যাবানা এই ফ্যাব্রিকের ব্যবহার করে শক্তিশালী রোমান্স বোঝাতে। লঞ্জারিতে ভেলভেট মানে বিলাসিতা ও সাহস। বিশেষ মুহূর্তের জন্য তৈরি এক আত্মবিশ্বাসী নির্বাচন।
রোমান্টিক ফ্যাব্রিক আসলে একেকটি অনুভূতি। কখনো মায়াবী, কখনো দৃঢ়, কখনো নীরব, কখনো গভীর। একসঙ্গে নারীর বহুমাত্রিক সত্তাকে তুলে ধরে। পোশাক-পরিচ্ছদ, সাজসজ্জা—সবই সামাজিক হলেও রোমান্টিক ফ্যাব্রিক খানিকটা ব্যক্তিগত।

 নাঈমা তাসনিম
মডেল: সায়েম ও ইরা
মেকওভার: পারসোনা
ছবি: জিয়া উদ্দীন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top