কভারস্টোরি I পোয়েটকোর পোয়েট্রি
অতি আধুনিকতা চেপে বসেছে জেনারেশন জেডের বুকে। একের পর এক আবিষ্কার। নতুনের অহেতুক ভিড়। আগুনের দিন। দিনের অসুখ। সবাই ছুটছে, দিগ্বিদিক। কখনো অতি আনন্দ, কখনো গভীর বিষাদ। এমন ক্ষণে হিমের চলে যাওয়ার দিনে মনে পড়ে পুরোনো বইয়ের পাতা, প্রিয় লেখক, পছন্দের কবি অথবা হারানো প্রেম। শৈশবের রঙিন উলের ঘ্রাণ, কৈশোরের লেইসের স্কার্ফ। হারিয়ে যাওয়া প্রিয় মানুষের পুরোনো চাদরের ঘ্রাণ। শীত বিদায়ের সময়টাতে ঈষদুষ্ণ আলিঙ্গন। সারাহ্ দীনার বুননে বাকিটা
পোয়েটিক ফ্যাশন অ্যাসথেটিক। সরল নাম পোয়েটকোর। শিকড় সাহিত্যের গভীরে। না, কল্পনার চরিত্ররা এখানে এসে ধরা দেয় না। কোনো চরিত্রের মতো করে পোশাক পরিকল্পনার প্রয়োজন নেই। এই কোরে তারাই আছেন আলোচনায়, যারা তৈরি করেছেন ফিকশনাল ক্যারেক্টার। সেই লেখক, কবিরা। আরও আছেন তারা, সেই সব প্রফেসর, যাদের কণ্ঠে পুরো ক্লাস জেনেছে অমিতের লাবণ্য, ওথেলোর ডেসডিমোনাকে। জেনারেশন জেডের ঠাসবুনটের জীবনে পোয়েটকোর এক টুকরো কমলা রঙের রোদ। খানিকটা নস্টালজিক, মেলানকোলিক আর ভীষণ রকম রোমান্টিক। যেন সেই পুরোনো দিনের মাখন-মসৃণ উড পাল্প পেপারে ফাউন্টেইন পেনের গাঢ় কালির অক্ষর! আর তাতে বুঁদ মুগ্ধ পাঠক। লেখককে, কবিকে ভালো লেগে যায়। প্রেমে পড়ে যায় মন। তাদের মতো করে নিজেকে সাজিয়ে নেওয়ার তাড়না অনুভূত হয়। আলোচিত আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘ন হন্যতে’র পাতায় পাতায় মৈত্রেয়ী দেবীর প্রিয় কবির জন্য মন কেমনের যে গল্প ছিল, ঠিক তেমনটাই অনুভূত হয়। কারও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্য, কারও মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্য। আবার, কখনোবা প্রিয় লিটারেচার প্রফেসরের কণ্ঠে শোনা সংলাপ কানে ভাসে। গমগমে কণ্ঠে উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের হেমলেটের সেই সংলাপ, ‘টু বি অর নট টু বি, দ্যাট ইজ দ্য কোয়েশ্চেন’। সঙ্গে সঙ্গে চোখে ভাসে তার ভিন্টেজ লুক। পুরোনো ব্লেজার আর ট্রাউজারের পেয়ার আপ।
ডিকোডিং পোয়েটকোর
সাহিত্যিকদের জগতের সঙ্গে হেরিটেজ টেক্সটাইলের সন্ধি। ফ্যাশন আর আর্টের কোলাব যেন। থটফুল ওয়্যারড্রোব প্ল্যান। মিউটেড কালার প্যালেটে উত্তরাধিকারের শিলালিপি। ইনটেনশনাল লেয়ারড টেক্সচার। নিটিংয়ের নিবিড়তা সেখানে দৃশ্যমান। সফট টেইলরিং প্রাসঙ্গিক। ড্রামা নয়; মুড তাতে গুরুত্বপূর্ণ। পোয়েটকোর রোমান্টিক, ইন্টেলেকচুয়াল। মোটেই লাউড নয়। কিছুটা শান্ত। ট্রেন্ড লিড নয়। থটফুল। ক্ল্যাসিক। যেন ড্রেসিং বাহ্যিক রূপের জন্য নয়; দর্শন, সাহিত্যিক মন সেখানে গুরুত্বপূর্ণ। এর আগেও একাডেমিক অ্যাসথেটিকের সঙ্গে দেখা হয়েছে ফ্যাশনিস্তাদের। কিন্তু পোয়েটকোর সেসব থেকে আলাদা। এখানে বই আছে। আছে সাহিত্য। তাই বলে আটকে নেই শক্ত মলাটের পাতায়; বরং বইপড়ুয়াদের দুনিয়ায়ও যে ফ্যাশন আসে! আসে ভালোবাসা। তা নিয়েই বিস্তরণ। এখানে হেরিটেজ টেইলরিং আছে। আছে গ্র্যান্ডমা কোরের ছোঁয়া। কিছুটা আর্কাইভ্যাল ফ্যাশনও আছে। কিন্তু কোনোটাই আটকে রাখেনি অ্যাসথেটিককে। নিজের মতো স্বাক্ষর রেখেছে পোয়েটকোর। বছরের শুরুতে সার্চ ইঞ্জিনে ১৭৫ ভাগ বেড়েছে এই ফ্যাশন কোরের খোঁজ। সেই টারটেল নেক, ভিন্টেজ ব্লেজার, এলবো প্যাচেস, মিডি, স্কার্ট—সব ফিরবে প্রোডাক্ট লাইনে। মেসেঞ্জার ব্যাগ, শ্যাচেল, ফাউন্টেইন পেন যোগ হবে অনুষঙ্গ হিসেবে। যেন প্রতিটি চরিত্র নিজ নিজ কাহিনিতে হয়ে উঠবে প্রোটাগোনিস্ট। চিন্তাশীল, সাহিত্য-অনুপ্রাণিত ফ্যাশন চয়েস। ফাস্ট ফ্যাশনের এই কালে হাজির হলেও ট্রেন্ডের সঙ্গে খাতির নেই তেমন; বরং বেশ বৈপরীত্য প্রকাশিত।
লিটারেচার লাভ
গ্র্যান্ড মিলেনিয়াল এবং ডার্ক একাডেমিয়া স্টাইলকে নতুন করে ফিরিয়ে আনবে পোয়েটকোর। কিন্তু সেখানে পড়ুয়ারা নন; মুখ্য চরিত্রে লেখকেরা। ডার্ক একাডেমিয়ায় দেখা গিয়েছিল এডুকেশনাল ইনস্টিটিউশন আর গথিক আর্কিটেকচার। কিন্তু পোয়েটকোর পুরোটাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক। সেখানে কোনো প্রতিষ্ঠান প্রাসঙ্গিক নয়। পিন্টারেস্টে ২০২৫ সালের শেষে পাওয়া যাচ্ছিল আভাস। যেন এক বছর আগে এসে গিয়েছিল ট্রেলার। পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র পর্দায় এলো এ বছর! আর পুরোনো একাডেমিক ফ্যাশন কোরের সঙ্গে তুলনা করলে, পোয়েটকোর অন্য সব কটির চেয়ে একটু কম গম্ভীর; বরং বেশ খানিকটা ভাবালু আর রোমান্টিক। স্বতন্ত্র আবেগের প্রকাশই নজর কাড়ে এখানে। যেন একজন লেখক তার লেখার টেবিলে বসে লিখছেন আপন মনে; যা ফিরিয়ে নিয়ে যায় পুরোনো দিনে। নস্টালজিক করে দেয়, অজান্তেই।
প্রোডাক্ট লাইন
লেয়ারিং
পোয়েটকোরে লেয়ারিং খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একের পর এক, যা ইচ্ছা তা-ই চাপিয়ে নিলেই হবে না। এখানেও চিন্তাশীলতা গুরুত্বপূর্ণ। ওভারসাইজড ভিন্টেজ ব্লেজার, যাতে এলবো প্যাচেস আছে দৃশ্যমান হয়ে। ইন্টেলেকচুয়াল প্রফেসর ভাইব তৈরি হতে পারে। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির আঙিনায় নি লেন্থ জোব্বায় রবিঠাকুরকেও মনে পড়ে যেতে পারে। যেখানে লেয়ারিংয়ে জায়গা করে নিতে পারে ব্লেজার। ভিন্টেজ ইন্সপায়ারড গ্রানি শিক রাজত্ব করবে।
কার্ডিগান
হালকা শীতের সময়টাতে কার্ডিগানও চলবে। কিন্তু হালকা বুননের। ভারী কিছু নয়। মাঘ থেকে ফাল্গুন যাত্রায় যতটা উষ্ণতা প্রয়োজন, সে অনুযায়ী। বেল্টেড কার্ডিগান, পেপলাম সোয়েটার মানাবে। স্টাইলিংয়ে শুধু আটকে নেওয়া যেতে পারে ওপরের দুটি বাটন। এর বেশি নয়।
ড্রামাটিক সিলুয়েট
ফ্যাশনেবল করতে ড্রামাটিক টাচ ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে তা একদমই অতিরঞ্জন নয়। যতটা দরকার, ঠিক ততটাই। বোল্ড সিলুয়েটে ভলিউমনাস স্লিভ থাকতে পারে। ফ্যাশন ফরোয়ার্ড হতে পারে প্যাটার্ন। কিন্তু সেখানেও লস্ট ইন দ্য লাইব্রেরি অ্যাসথেটিক ভূমিকা পালন করবে বলে ধারণা করা যায়।
ওভারসাইজড
ওভারসাইজড করবে রাজত্ব। সবকিছুতেই। টপ টু বটম। সোয়েটার থেকে টারটেল নেক টপ—সবেতেই সই। ব্লেজারও হবে তেমন। বড়সড়। আঁটসাঁট নয়। লুজ ফিটিং।
বটম ওয়্যার
সিলুয়েট সেখানেও হবে লুজ। আঁটসাঁটকে বিদায়। বিগ নো একদম। আরামদায়কতা এখানে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। প্লিটেড স্কার্ট, ওয়াইড লেগ ট্রাউজার, ব্যারেল লেগ প্যান্ট, বারমুডা শর্টস ভিন্টেজ ট্রাউজার, প্লিটেড, মিডি আর মিনি থাকতে পারে বটমে।
টাই
টাই এখানে শুধু নেক ওয়্যার নয় মোটেই। স্টাইলিংয়ের জন্য নানাভাবে ব্যবহৃত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। রিইনভেনশন হতে পারে। ফরমাল ওয়্যার হিসেবে তো থাকবেই। তার বাইরে লুজ নটেও বাঁধবেন কেউ কেউ। মজার বিষয় হচ্ছে, পোয়েটকোর পুরোনোকে উদ্যাপন করবে বলে নতুনের সঙ্গে আড়ি নয়। সৃজনশীলতা এখানেও দেখা যাবে। কেউ টাইকে বেল্ট বানাবেন তো কেউ করবেন হেয়ারস্টাইলিং। রোমান্টিক কিন্তু ইন্টেলেকচুয়াল। লিনেন, কটন, উলের মতো ব্রিদেবল ফ্যাব্রিক থাকবে। লেইস আপ করসেট, রাউন্ডেড স্কয়ার শেপ নেক লাইন, ফ্লাটার স্লিভ আর পকেটে পুরোনোকে ছুঁয়ে যাওয়া।
কালার প্যালেট
পোয়েটকোর কালার প্যালেট থেকে আর্দি, মিউটেড টোনকে খুঁজে নেবে। পুরোনো বইয়ের হলুদ হয়ে যাওয়া পাতা, দোয়াতের কালি, শরতের আবছা বিকেল থাকবে সেখানে। ক্রিম, পার্চমেন্ট পেপারের রং, অক্সব্লাড রেড, ফরেস্ট গ্রিন, চারকোল, সফট ব্ল্যাক প্রাসঙ্গিক হবে। পুরোনো চামড়ায় তৈরি ডায়েরির কথা মনে আছে? সেখান থেকে নেওয়া গাঢ় বাদামি থাকবে। আবার পুরোনো বইয়ের বাঁধানো কভারে খুঁজে পাওয়া যায় যে ভিন্টেজ ভেলভেট, সেখান থেকে নেওয়া বারগ্যান্ডিও থাকবে। ব্রাইট শেড সেভাবে জায়গা পাবে না বলা চলে। পুরোটাতেই পুরোনোকে মনে পড়বে। নস্টালজিয়ার মাখো মাখো সবকিছুতে তৈরি হবেন ফ্যাশনিস্তারা। এই প্যালেটকে বলা যেতে পারে মুডি, ভিন্টেজ, রোমান্টিক প্যালেট। নিউট্রালে বেইজ, ক্যামেল, ক্রিম আর অফ হোয়াইট। ডার্ক টোনে চকলেট ব্রাউন, ক্যাশিউনাট, কালো আর কয়লার ধূসরতা। এর বাইরে সেপিয়া গ্রিন থাকবে মসনদে।
স্টাইল এক্সট্রা
শ্যাচেল ব্যাগ এই কোরে থাকবে। এসেনশিয়াল আইটেমের মতোও হয়ে উঠতে পারে। লেদার মেসেঞ্জার ব্যাগও বেছে নিতে দেখা যাবে অনেককে। যেখানে নোটবুক, প্রিয় বই, ফাউন্টেইন পেন থাকবে সঙ্গী হয়ে। কফি শপে এক কাপ লা-তের ফরমায়েশ আর ব্যাগ থেকে প্রিয় কবির বই বের করে কয়েক পাতা পড়ে নেওয়া। ইচ্ছা হলে কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে দুই লাইন লিখে নেওয়া। অথবা প্রিয়জনের তরে দুই লাইনের স্তুতি। হ্যান্ডক্রাফটেড কমিউনিকেশন ফেরত আসার শব্দ শোনা যায়। ধীরে। চোখে চশমা প্রয়োজন না হলেও ফ্যাশন অ্যাকসেসরি হিসেবে যোগ হতে পারে রিডিং গ্লাস।
পারসোনাল টাচ
ব্রোচ অ্যাসথেটিকও সঙ্গত দেবে পোয়েটকোরকে। মিলেনিয়াল আর জেন-জিদের মধ্যে এর চাহিদা যে তৈরি হয়েছে, তা জানান দেয় পিন্টারেস্ট। সার্চ অপশনে ব্রোচ অ্যাসথেটিক বেড়েছে ১১০ শতাংশ। ভিন্টেজ, হেয়ারলুম, ক্রিস্টাল পিন ব্যবহারকারীকে আরও বেশি নিজস্বতা যোগ করতে সাহায্য করবে। যদিও এটি ম্যাক্সিমালিজমের অংশ, তবু এখানে থাকবে স্বমহিমায়। ভিন্টেজ এই ক্র্যাফটম্যানশিপ যেমন পুরোনোকে আলিঙ্গন করবে, তেমনি উত্তরাধিকারের গর্বকেও ফিরিয়ে আনবে বলে ধারণা করা যায়। ইনিশিয়াল, সিগনেচারের মতো বিষয়ও ব্যবহৃত হতে পারে মোটিফ হিসেবে। ব্লেজারের ল্যাপেল কলারে, স্কার্ফে, শ্যাচেল ব্যাগে, জুতায় দেখা মিলতে পারে এমন পারসোনাল পিসের। এখানে নকশা যতটা সুন্দরতা প্রকাশ করবে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে অর্থের দিক থেকে। অর্থাৎ মিনিংফুল ব্রোচ থাকবে গুরুত্বে।
নিত্যদিনের মন্ত্রণা
দৈনন্দিন যাপিত জীবনে পোয়েটকোর ইতিমধ্যেই মিশে আছে। আরও মিশে যাবে। পুরোনো দিনকে মনে করাবে আলগোছে। ডাকপিয়নের হাতে হলুদ খামে পাওয়া চিঠিকে মনে করাবে। স্মরণে আনবে ডায়েরি লেখার দিন। ই-বুক থেকে চোখ সরবে কাগুজে বইতে; যা ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে নতুনদের মাঝে। বুক ক্যাফে কালচারে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। লাইব্রেরির আদলে এসব জায়গায় হাতে কফি আর ক্রসোঁ নিয়ে অলস বিকেলে মুখোমুখি বসতে দেখা যাচ্ছে তাদের। ব্রেকফাস্ট ক্যাফেতেও ভিড় বাড়ছে। জনাকীর্ণ শহর নিরিবিলি কোনোখানে সকালবেলার মন কেমনের ক্ষণে কাটাচ্ছেন সময়। কেউ একা একা আবার কেউ সঙ্গীসহ—দুই-ই হচ্ছে জনপ্রিয়। যেন কিছু আবেগ সরিয়ে রাখা নিজের জন্য; আর কিছু ভাগ করে নেওয়া। ভাবালু; কিন্তু মোটেই আলুথালু নয়। খানিকটা পড়ুয়া, আর খানিকটা স্টাইলিশ। তবে ফাস্ট ফ্যাশনে বিগ নো। সাসটেইনেবলেই সহমত।
অনুরণন অনন্য
স্ক্রিন ডমিনেটেড কালচারে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি একের সঙ্গে অন্যকে যুক্ত করেছে। একাকিত্ব উপভোগের চাহিদা তাই অধরাই থেকে যায় অনেক সময়। সেখান থেকে একটুখানি অবসর খুঁজে এনেছে পোয়েটকোর। চিন্তার পুকুরে এখানে ঝাঁপ দেওয়া যায়। ডুবে যাওয়া যায় গভীরে। নিখুঁততা আবশ্যক নয়; বরং নিজস্বতা জরুরি। সেখানে প্রতি শীতে নতুন কার্ডিগান না হলেও চলে। পুরোনোতেও না নেই। এই অ্যাসথেটিক তুষ্ট হতে শেখায়। বহুমূল্য কিছু নয়। যা কিছু ইতিমধ্যে আছে অধিকারে, সেসবেই সই। শিকড়কেও মনে করিয়ে দেয় পোয়েটকোর। নিউক্লিয়াস ফ্যামিলিতে বেড়ে উঠেছেন যে মিলেনিয়াল আর জেনারেশন জেডরা, তাদেরকে মনে করিয়ে দেয় বয়োজ্যেষ্ঠদের স্মৃতি। গ্র্যান্ডমা কোরের মতো এখানেও প্রাসঙ্গিক পুরোনো ইতিকথা। ফ্যাশন ওয়েস্টেজের বিপক্ষে শক্তিশালী অবস্থান। অতিরঞ্জন নয়। যতটুকু প্রয়োজন, ঠিক ততটুকুই চাই। থ্রিফটিং, প্রি-লাভড তাই এখানে সংযুক্ত। ইথিক্যাল ফ্যাশন কনজাম্পশনের যথাযথ উদাহরণ। ক্রেতাদের জন্যও খানিকটা স্বস্তির। কারণ, প্রতি ঋতু-পার্বণে নতুন পোশাকের চাপ নেই। খরুচে নয় এই ফ্যাশন কোর। পুরোনোকে ভালোবেসে পুরোটা দিয়ে দেওয়ার জন্য তৈরি বরং। ফ্যাশন আউটলেটের আইলে ঘুরে নয়; এই কোরে ফ্যাশনিস্তা হওয়া যেতে পারে নানি-দাদির আলমিরা খুলে। যেখানে টানটান ভাঁজ করে রাখা পশমি চাদর থাকে। যেখানে শোভা পায় দাদা-নানার পুরোনো ব্লেজার। নাক টেনে ঘ্রাণ নিলে নস্টালজিয়া ঘিরে ধরে। এমনটাই পোয়েটকোর।
পোর্ট্রেইং পোয়েটকোর
নতুন কেনা বারণ নয়; কিন্তু কেনাও আবশ্যক নয়। সবার আগে আলমিরা খুলে তাকানো চাই মনোযোগ দিয়ে। কী আছে সেখানে, তাক আর ড্রয়ারজুড়ে। আরও খোঁজ নেওয়া যেতে পারে দাদা-নানা-দাদি-নানির পুরোনো কাপড়ের। যদি থাকে তেমন কিছু, তাহলে সেখান থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে যতটা নিয়ে নেওয়া যায়, ততই সৃজনশীলভাবে সম্পন্ন করা যাবে স্টাইলিং। গ্র্যান্ডমা কোরের বেশ খানিকটা আছে পোয়েটকোরের কেন্দ্রে। শৈশবের প্রিয় মানুষেরা হারিয়ে গেলেও তাদের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য থাকতেই পারে কিছু পোশাক; সেগুলো যোগ করা যেতে পারে ওয়্যারড্রোব প্ল্যানিংয়ে। আর গ্র্যান্ড প্যারেন্টরা যদি সুস্থ থাকেন, তাহলে তো কথাই নেই। আবদার মেটানোর চাহিদা থেকে ভরিয়ে নেওয়া যেতে পারে ক্লজেট। দাদির সোয়েটার, দাদার টারটেল নেক, নানির লেদার পার্স, নানার ব্লেজারে হতেই পারে পোশাক পরিকল্পনা।
চাইলে বাজার ঘুরে কিনে নেওয়া যেতে পারে মিউট কালারের ব্রিটিশ ইন্সপিরেশনাল ড্রেস। কিন্তু পোয়েটকোর বলে অন্য কথা। পুরোনোতেই থাকুক ভরসা। নতুন তোলা থাকুক অন্য কোনো কোরের জন্য। পোয়েটকোরের প্রেম সেসবের সঙ্গে, যেসবে মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শেক্সপিয়ার, চার্লস ডিকেন্স, টি এস এলিয়ট, জর্জ অরওয়েল, জর্জ এলিয়ট, লর্ড বায়রন, উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ, জন কিটস, অস্কার ওয়াইল্ডকে। এ যেন উত্তরাধিকারের সবটা ছুঁয়ে দেখা। যেসব সাহিত্যিকের সঙ্গে পরিচয় বই খুলে বসার আগেই, যাদের নাম কানে এসেছে দাদার মুখে শুনে অথবা নানির প্রিয় কবির রূপে, তাদেরকেই আরেকবার ছুঁয়ে যাওয়া। ফ্যাশন আর সাহিত্যের মিশ্রণে নিজেকে সাজিয়ে নেওয়া। যেন প্রিয় বই থেকে উঠে আসা কোনো চরিত্রকে নিজের পুরোটা দিয়ে সাজিয়ে নেওয়া। পারফেকশন বলে এখানে কিছু নেই; বরং পুরোটাতেই মায়া। কখনো সাহিত্যের প্রতি, কখনো লেখকের প্রতি, কখনো তা বাতিল পোশাকে তো কখনো ধরণীকে ঘিরে। কোনো ছুটে যাওয়া নেই। আছে শুধু ঢিমেতালে প্রিয় গানের সুরে হারিয়ে যাওয়ার গল্প। দেখনদারি একেবারে নেই এই কোরের। প্রমাণ করার জোরজবরদস্তিতে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছেতাইও নয়। তার চেয়ে বরং বেশি আছে নিজের মতো করে নিজেকে গুছিয়ে নেওয়া। ক্ল্যাসিক সাহিত্যের কোনো চরিত্রকে দৃশ্যমান করার জোরজবরদস্তি নেই। নিজের ওয়্যারড্রোব প্ল্যানিংয়ে থাকতে পারে পছন্দের লেখক কিংবা চরিত্রের খানিকটা স্পর্শ। পোয়েটকোর সময়ের রেখায় বাঁধা পড়ে না। যা এই কোরকে তরুণদের কাছে ইতিমধ্যে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব, স্বপ্নভঙ্গ—এমন অনেক কিছুই আছে জেনারেশন জেডদের স্মৃতিতে। সেখানে নতুন করে কিছু যোগ করার প্রয়োজন নেই। পুরোনোতেই সই।
স্টাইলিং টিপস
লেয়ারিং থাকবে ইন-ট্রেন্ড। আবার, শুধু একটি টেক্সচারেই গোছাতে হবে সবটা, এমন নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী বেছে নেওয়া যেতে পারে। যেখানে উল, লিনেন, কটনের মতো কম্বাইন্ড স্ট্রাকচার পিস থাকতে পারে অনায়াসে। থটফুল অ্যাকসেসরিজ ব্যবহারের চল থাকবে। সিলুয়েটে আরাম পাবে গুরুত্ব। ভিন্টেজ স্টাইল লেদার বুটস, লোফার অথবা সাধারণ ক্যানভাস স্নিকারস থাকতে পারে। কমফোর্টেবল এলিগ্যান্স গুরুত্ব পাবে। ড্রামাটিক ফ্যাশনের আয়োজন খানিকটা তোলা থাকবে এবারে। আবার, তার মানে এই নয় যে কেনাকাটা বন্ধ করে দিতে হবে। প্রয়োজনে চলবে কেনাকাটা, শুধু টেকসই তত্ত্ব মাথায় রেখে। মডার্ন জিনসের সঙ্গে পেয়ার আপে থাকতে পারে ভিন্টেজ ব্লেজার। কনটেম্পরারি ট্রাউজারকে সঙ্গত দিতে পারে টারটেল নেক টপস। কাঁধে ঝুলতে পারে নতুন কেনা লেদার শ্যাচেল অথবা মেসেঞ্জার ব্যাগ।
কেন প্রাসঙ্গিক
ফ্যাশন বর্জ্যে মাটি, জল—সব আজ বিপন্ন। দূষণে করুণ ধরণীতে দায় কম নয় ফ্যাশন জগতের। জেনারেশন জেড প্রকৃতিপ্রেমে বুঁদ হয়েছে করোনা অতিমারির সময় থেকে। যতটা সম্ভব ততটা ক্ষতি থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছে, করে যাচ্ছে। তাই পুরোনো পোশাকের গুরুত্ব বেড়েছে। থ্রিফটেড, ভিন্টেজ, সেকেন্ডহ্যান্ড পিসের বাজার বড় হয়েছে। প্রি-লাভড ওয়্যার এখন আর অদ্ভুত কিছু নয়; বরং ইন ট্রেন্ড। পুরোনোকে নতুন করে গ্রহণের। যেখানে ফ্যাশন বর্জ্য তৈরি হয় কম; বরং ভিন্নভাবে ব্যবহারের তরিকা বিদ্যমান। টেকসই তত্ত্ব মগজে নিবিষ্ট। হাতে সেলাই, হাতে বোনা উল, অবসরে একটুখানি ফুলকারি নকশা—এসবকেই পুনরায় আলিঙ্গনের তাড়না এখানে। যেন বিদায় নয়; ফিরে পাওয়ার আনন্দই সবটাজুড়ে।
দেশি পোয়েটকোর
পোয়েটকোর কি শতভাগ পাশ্চাত্য ফ্যাশন? দেশি সাজে কি নৈব নৈবচ? তা আসলে নয়। এখানে ভূগোলের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক ইতিহাস আর সম্পর্ক। পোয়েটকোর স্টাইলিং দেশি স্টাইলে করতে চাইলে বেছে নেওয়া চাই এমন পোশাক, যা আদ্যোপান্ত টেকসই। ফ্যাব্রিকে ব্রিদেবল চয়েজ মাস্ট। রঙের ক্ষেত্রে উজ্জ্বল নয়, মিউটেড টোন। মায়ের হাতের উল-কাঁটায় বোনা ব্লাউজ কিংবা মাফলার, হাত তাঁতে বোনা শাড়ি, কুসি-কাঁটার লেইস, কাঠের বোতামে তৈরি করা যেতে পারে লুক। যেখানে দেশ থাকবে; থাকবে সাহিত্যপ্রাণিত ফ্যাশনও।
ফ্যাশন ডিজাইনার শাহ্রুখ আমিনের ভাষ্যেও মিলল এর যথার্থতা। তিনি জানান, ম্যাচি-ম্যাচি নয়; মিস ম্যাচ। কিন্তু থটফুল। সলিডের সঙ্গে ফুলকারি নকশা যেমন। লেয়ারিং ইম্পর্ট্যান্ট। জ্যাকেট, কোটি, কোট—সব চলবে। জুতায় নাগড়া, কোলাপুরি। ব্যাগ একদম আলাদা। বাকিটা রংচং হলে এটা হতে পারে রংচটা; বেসিক কিংবা আর্দি। ব্যস, জমাটি।
মডেল: আজরাফ ও প্রিয়ন্তী
মেকওভার: পারসোনা
ওয়্যারড্রোব ও স্টাইলিং: শাহ্রুখ আমিন
ছবি: জিয়া উদ্দীন
