ইন্টারন্যাশনাল ফ্যাশন I বনবিবির বরদান
ওয়্যারেবল বোটানিক্যাল আর্ট স্বমহিমায় উদ্ভাসিত। যেন প্রকৃতি মৃদুলয়ে জানান দেয় আত্মপরিচয়। রেইনফরেস্টের সূর্যোদয় ফুটে ওঠে ফ্যাব্রিকের ক্যানভাসে। আবার কখনো রুদ্রাক্ষের রুদ্র বিন্যাস। অথবা সিলুয়েটে প্রতিশব্দ হয়ে ফিরে আসে ফার্ন। যেন বনের দেবীর আশকারার চূড়ান্ত
দুনিয়া বহুরূপী। নির্নিমেষ চলে মগজের যুদ্ধ। দ্রুত লয়ের শহুরে জীবনে শিকড় যেন অচেনায় বিলীন। প্রকৃতিপ্রেমে মন কেমনের গল্প রচিত হয়েছে করোনাকালেই। শেষমেশ ধরণী কোলে যে স্বস্তি মেলে, তা বোঝা গেছে হাড়ে হাড়ে। ফ্যাশন বাজারও ধরণী প্রেমের আবেশে ডুবে আছে তখন থেকে। তাল মিলিয়ে চলেছে বিভিন্নভাবে পৃথিবীকে ভালো রাখার প্রত্যয়। হাজার জন কাজ করেছেন হাজার রকম কৌশলে। ফ্যাশনে নিজস্বতা ও টেকসই তত্ত্বের প্রাপ্তি। হাই ফ্যাশন ব্র্যান্ড, রানওয়ে, স্ট্রিট স্টাইল—সবখানে দেখা যাচ্ছে এই নতুন ধারা। কোনো পাতালপুরীতে প্রাণভ্রমরের মতো কুক্ষিগত হয়ে নেই মোটেই। এখনকার আলোচিত ওয়্যারেবল বোটানিক্যাল আর্টগুলো শোপিস নয় শুধু; বরং প্রতিটিই বাস্তবসম্মত নকশায় তৈরি।
লিভিং বোটানিক্যাল
এ বছর ওয়্যারেবল বোটানিক্যাল থিমের ফ্লাওয়ার মোটিফগুলো প্রস্ফুটিত। একদম জীবন্ত। পোশাক যেন ক্যানভাস সেখানে। কখনো ব্যবহার করা হয় টেকচারড ফ্যাব্রিক, কখনো লেয়ার কনস্ট্রাকশন আবার কখনো স্ক্যাল্পচারাল ডিটেইলিং। কাপড় বদলে হয়ে যায় ফুল-পাতা। তৃতীয় মাত্রিক এসব নকশায় প্রস্ফুটিত হয়। কখনো সারফেসে বোল্ড প্রিন্টস, কখনো পাতাবিলাস কিংবা পাপড়ির উদ্ভাসন। রেডি টু ওয়্যারে বোটানিক্যাল আর্ট পাওয়া যায় বিভিন্ন মাধ্যমে। সুতি, সিল্ক, মসলিন, লিনেনে ডিজিটাল ট্রান্সলেটেড বোটানিক্যাল ইলাস্ট্রেশন দেখা গেছে। অ্যাপ্লিক ও প্যাচওয়ার্কে তৈরি করা হয়েছে পাপড়ি, পাতা আর লেয়ারড টেক্সচার। সারফেস ম্যানিপুলেশনে দেখা গেছে স্মোকিং, প্লেটিং, কাটওয়ার্কে তৈরি পেটাল আর প্ল্যান্ট অ্যানাটমি। রঙের ক্ষেত্রেও প্রকৃতির স্পর্শ। ইন্ডিগো, মেরিগোল্ড, চায়ের মতো অনেক উপাদান শিল্পের এই অধ্যায়কে টেকসই তত্ত্বের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
কেন এই সঙ্গতা
ওয়্যারেবল বোটানিক্যালসের প্রতি এই অনুরাগের পেছনে কিছু কারণ খুঁজে পাওয়া যায়। প্রযুক্তির অবিশ্বাস্য গতিতে এগিয়ে যাওয়া দেখা গেছে কয়েক বছর ধরে। স্ক্রিনেই কেটে যায় দিবারাত্রি। ফলাফল, জেনারেশন জেড খুব অল্প বয়সে ভারাক্রান্ত হয়েছে তথ্যের ভারে। যেন ডেটা সেন্টারেই তাদের বসবাস। এমন যখন জীবন, সেখানে হাঁপিয়ে ওঠার হাপিত্যেশ তৈরি হওয়া অসম্ভব নয় বলা চলে। তাই প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার চেষ্টায় এই বিশেষ ধরনের নকশাপ্রিয়তা জোরালো হয়েছে; যার ধারাবাহিকতায় একটি টার্ম জায়গা করে নিয়েছে। ‘ওয়াইল্ডারকাইন্ড’; যা ২০২৬ সালের ফ্যাশন বাজার দাপিয়ে বেড়াবে বলে ধারণা। প্রকৃতিপ্রাণিত ফ্যাশন অ্যাসথেটিক এটি। কেননা, ফ্যাশনে তো সমসাময়িক সাংস্কৃতিক অবস্থার ঘটে প্রকাশ।
টেকসই তত্ত্ব মেনে
ইকো-কনশাস ফ্যাশনের অংশ এই ওয়্যারেবল বোটানিক্যাল আর্ট। ডিজাইনার ও ব্র্যান্ড—দুই-ই চিন্তা করে টেকসই উপাদান, নৈতিক উৎপাদন, স্থানীয় কারিগর, সৃজনশীল সহযোগিতা গ্রহণের মাধ্যমে কাজটি সম্পন্নের। এই চেষ্টার উদ্দেশ্য প্রকৃতির সুনিপুণ নকশাকে পোশাকে যুক্তকরণ। যাতে শুধু পোশাকের অলংকরণেই প্রকৃতিপ্রেমের প্রকাশ সীমাবদ্ধ না থেকে গুণে-মানেও ধরণীর জন্য ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করে। উপাদান সংগ্রহ থেকে শুরু করে মোড়কজাতকরণ—সবখানেই এই প্রত্যয় প্রমাণিত। পৃথিবীকে ভালো রাখার চেষ্টায় নিরলস পরিশ্রম।
নিজস্বতার আখ্যান
এখনকার ক্রেতাদের সচেতনতা তুলনামূলক বেশি। তারা নিজেদের চাহিদা প্রকাশ করেন মন খুলে। সেখান থেকে ধারণা করা যায় ওয়্যারেবল বোটানিক্যালের ক্ষেত্রে বুনো মোটিফ আর বনের সঙ্গে মনের সংযোগ পাবে গুরুত্ব। অর্কিড থেকে দ্রাক্ষালতা—এমন অনেক কিছু জায়গা করে নিতে পারে; যেখানে আবেগ, স্মৃতি মিলেমিশে একাকার। খালি পায়ে শীতল নরম ঘাসের স্পর্শ যেমন মনে পড়ে যায়, তেমনি অজানা ফুলের আভাস নতুনকে জানার আগ্রহে মনকে করে প্রাণিত।
রানওয়ে টু রিয়েল লাইফ
স্প্রিং/সামার ২০২৬ কালেকশনে প্রকৃতির অনুপ্রেরণা নতুন দুয়ার খুলেছে। কোপেনহেগেন ফ্যাশন উইকে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান ডিজাইনাররা থ্রি ডাইমেনশনাল ফ্লোরালস, লেয়ারড পেটালস, লেজার কাট অরগ্যাঞ্জা ব্যবহার করেছেন। সেখানে এমন ফুল-পাতার নকশা মিলেছে, যেন ফ্যাব্রিক থেকে সেসব প্রস্ফুটিত হচ্ছে প্রাকৃতিকভাবে। ঠিক এতটাই জীবন্ত ছিল রানওয়ের কিছু কালেকশন। ফ্যাশন আর ফাইন আর্টসের মধ্যের পার্থক্য যেন হয়ে গিয়েছিল বিলীন।
স্টেটমেন্ট অ্যাকসেসরিজ
ওয়্যারেবল বোটানিক্যাল শুধু পোশাকেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; গয়নাগল্পেও জায়গা করে নিয়েছে। হাইপার রিয়েলিস্টিক ফ্লোরাল ইয়াররিংস থেকে শুরু করে ভাইন-লাইক রিংস; যা দেহ জড়িয়ে রাখে, এমন গয়না নিয়েও কাজ হয়েছে। হ্যাট, ব্যাগ, বেল্টেও সংরক্ষণ করে রাখা অর্কিড, মেটালিক লিভস এবং স্ক্যাল্পচারাল পেটালস স্ট্যান্ডআউট করেছে ওয়্যারেবলস আর্ট অবজেক্ট হিসেবে। ওয়্যারেবল বোটানিক্যাল আর্ট যে শুধু এই বছরেরই বিষয়, তা নয়। আগেও এমন কাজ দেখা গেছে। ধারাবাহিকতায় খুঁজে পাওয়া যায় বেশ কয়েকজন প্রকৃতিপ্রেমী ফ্যাশন ডিজাইনারের গল্প।
পওলা উলারগি এস্কেলোনা
স্প্রিং/সামারের মেনসওয়্যার কালেকশনে বায়োডিজাইনার পওলা উলারগি এস্কেলোনা। স্প্যানিশ লাক্সারি ব্র্যান্ড লোয়ির সঙ্গে তিনি একত্রে একটি বিশেষ কালেকশন নিয়ে কাজ করেছিলেন। তাতে ফ্যাশন অ্যান্ড ন্যাচারের ফিউশন প্রকাশ পেয়েছে। ডিজাইনে তাজা ঘাস অবাক করেছিল ফ্যাশনিস্তাদের।
জিনা হলওয়ে
লন্ডন বেসড আর্টিস্ট জিনা হলওয়ে প্রাকৃতিক শিকড় ব্যবহারে সম্পন্ন করেছিলেন নকশা। এমন ডিজাইনে তৈরি হয়েছে বায়োডিগ্রেডেবল বোটানিক্যাল স্কেলেটন।
ফ্রাঁসোয়াস উইকস
পোর্টল্যান্ড বেসড ফ্লোরাল ডিজাইনার ফ্রাঁসোয়াস উইকস তার বোটানিক্যাল কতুরে ডিটেইলড কিন্তু টেম্পরারি আর্ট পিস দেখিয়েছেন। পোশাক, পার্স, জুয়েলারিসহ অনেক কিছু দেখা যায় প্রোডাক্ট লাইনে।
বিশ্বখ্যাত ডিজাইনার ক্রিশ্চিয়ান ডিওরেরও প্যাশন ছিল গার্ডেন থিম নিয়ে। যার প্রমাণ মেলে তার ডিজাইন করা গাউন, সিলুয়েট ও এমব্র্রয়ডারি ডিটেইলসে। আইরিশ ভ্যান হারপেনের কাজেও এমন প্রকৃতিপ্রেম দেখা গেছে। ক্রিয়েটিভ বায়োমিমিক্রিতে প্রকাশিত হয়েছে সৃজনশীলতা। কেন স্কট পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন ফ্যাশন গার্ডেনার হিসেবে। তৈরি করেছেন ওভারসাইজড, ভাইব্র্যান্ট বোটানিক্যাল প্রিন্ট; যা গুচির এপিলগ কালেকশনে জায়গা করে নেয়। ফ্যাশন ডাইরেক্টরিসহ অনেক ট্রেন্ড ভবিষ্যদ্বাণীতে আভাস পাওয়া যায়, এবার চাহিদা বাড়বে ওয়াইল্ডারকাইন্ডের। বিশ্ব ফ্যাশন ট্রেন্ড রিপোর্টগুলোর মতে, সাসটেইনেবিলিটি ও বায়ো-ইন্সপায়ারড ডিজাইনের ওপর জোরারোপের ফলে এ বছর বুননে বনায়নের আরও বিস্তৃতির সম্ভাবনা আছে। এর পেছনে কাজ করবে স্লো ফ্যাশন, মাইন্ডফুল ড্রেসিং, প্রকৃতিপ্রেম আর ডিজিটাল প্রোডাকশনের বিপরীতে অবস্থান।
ফ্যাশন ডেস্ক
ছবি: ইন্টারনেট
