টেকসহি I সাসটেইনেবল লাভ লাইফ
‘যে প্রেম স্বর্গ থেকে এসে জীবনে অমর হয়ে রয়’—টেকসই প্রেমের ক্ষেত্রে এমন ধারণা সত্যের কাছাকাছি। প্রেম এমন এক শক্তি, যেটির স্থায়িত্ব গড়ে ওঠে যত্ন, শ্রদ্ধা, বিশ্বাস এবং পারস্পরিক দায়বদ্ধতার মধ্য দিয়ে। দৈনন্দিন জীবনের চাপ, মতভেদ ও পরিবর্তনের মাঝেও যে প্রেম টিকে থাকে, তা ধারাবাহিক চর্চার ফল। লিখেছেন সুস্মিতা চক্রবর্তী মিশু
টেকসই প্রেম জীবনে দীর্ঘদিন টিকে থাকে নিজ রূপান্তর ক্ষমতার মাধ্যমে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়তো আবেগের তীব্রতা কমতে পারে। কিন্তু যদি ভালোবাসা দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা এবং একে অপরকে জায়গা দেওয়ার মানসিকতায় পরিণত হয়; তাহলে প্রেম হারায় না, কেবল রূপ বদলায়। এই রূপান্তরই প্রেমকে দীর্ঘমেয়াদি করে তোলে। তাই ভালোবাসার অমরত্ব কোনো অলৌকিক উপহার নয়; এটি দুজন মানুষের সচেতন সিদ্ধান্ত, পারস্পরিক সম্মান এবং অবিরাম যত্নের সম্মিলিত ফল।
ভালোবাসা হঠাৎ জন্ম নিতে পারে। কিন্তু সেই ভালোবাসাকে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখা তথা টেকসই করে তোলা কখনোই হঠাৎ ঘটে না। সাসটেইনেবল লাভ লাইফ বা টেকসই প্রেমের জীবন গড়ে ওঠে দায়িত্বশীল আচরণ, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং সময়ের সঙ্গে বদলে নেওয়ার সক্ষমতার ভেতর। দ্রুতগতির বর্তমান সমাজে, যেখানে সম্পর্কগুলো সহজেই ভঙ্গুর হয়ে পড়ে, সেখানে সাসটেইনেবল লাভ লাইফ শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়; একটি প্রয়োজনীয় সামাজিক ও মানসিক চর্চাও।
আমরা সাধারণত ‘টেকসই’ শব্দটি পরিবেশ, উন্নয়ন বা অর্থনীতির আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করি। অথচ এই ধারণা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সমান প্রযোজ্য। টেকসই প্রেমের জীবন বলতে এমন এক সম্পর্ককে বোঝায়, যা মানসিকভাবে স্বাস্থ্যকর, নৈতিকভাবে দায়িত্বশীল এবং দীর্ঘ মেয়াদে দুজন মানুষের জন্যই নিরাপদ ও সম্মানজনক।
যে সম্পর্ক জীবনের চাপ সামলানোর এবং সময় ও পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার পাশাপাশি পারস্পরিক শ্রদ্ধা অটুট রেখে এগিয়ে যেতে পারে, সেটিই প্রকৃত অর্থে টেকসই। তাই বলা যায়, দীর্ঘমেয়াদি ভালোবাসার প্রথম ধাপ ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স তথা আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা। সম্পর্কের সুপারপাওয়ার হিসেবে এর জুড়ি মেলা ভার। ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স মানে সঙ্গীর অনুভূতির প্রতি সংবেদনশীল হওয়া। এটি শুধু সহানুভূতি নয়; বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে দুজনেই নিজের অপরিপূর্ণতা নিয়ে নিরাপদ বোধ করতে পারেন। যখন দুজনেই একে অপরের অনুভূতি বুঝতে এবং সম্মান করতে সক্ষম হন, তখন ছোটখাটো ভুল বা ভুল-বোঝাবুঝি সম্পর্কে বড় ফাটল তৈরি করতে পারে না।
সম্পর্কের যাত্রায় আসে নানা চ্যালেঞ্জ—চাকরির চাপ, পারিবারিক সমস্যা কিংবা ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব। ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সই তখন সম্পর্ক টিকিয়ে রাখে। সম্পর্ককে আঠার মতো দৃঢ় করে, জীবনের অস্থির মুহূর্তেও সংযোগ ধরে রাখে এবং দুজনকে একত্রে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেয়।
যেকোনো সম্পর্কের সবচেয়ে শক্ত ভিত হলো যোগাযোগ। টেকসই প্রেমের জীবনে যোগাযোগ মানে শুধু কথা বলা নয়; বরং মন দিয়ে শোনা, বোঝার প্রয়াস চালানো এবং প্রতিক্রিয়ায় সংবেদনশীল হওয়া। নিজের অনুভূতি স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা যেমন জরুরি, তেমনি প্রিয়জনের অব্যক্ত কষ্ট, ভয় বা দ্বিধাগুলো খেয়ালে সচেতন চেষ্টাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
অনেক সময় নীরবতা, মুখভঙ্গি বা আচরণেই লুকিয়ে থাকে গভীর অনুভূতি, যা বোঝার জন্য ধৈর্য ও সহানুভূতি প্রয়োজন। খোলামেলা ও সৎ যোগাযোগের অভাবে ছোট সমস্যা জমতে জমতে বড় দূরত্ব তৈরি করে, ভুল-বোঝাবুঝির জন্ম দেয় এবং সম্পর্কের মধ্যে অনিরাপত্তা বাড়ে। বিপরীতে, নিয়মিত, সম্মানজনক ও দায়িত্বশীল যোগাযোগ সম্পর্ককে নিরাপদ ও দৃঢ় করে তোলে, যেখানে দুজন মানুষ নির্ভয়ে নিজেদের কথা বলতে পারেন এবং সম্পর্কের ভেতর মানসিক আশ্রয় খুঁজে পান।
প্রেমকে আমরা প্রায়ই শুধু আবেগের জায়গা থেকে বিচার করি; উচ্ছ্বাস, আকর্ষণ কিংবা তীব্র অনুভূতির আলোকে। শুরুতে এই আবেগ সম্পর্ককে রঙিন ও প্রাণবন্ত করে তোলে; কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাস্তবতা সামনে আসে। তখন প্রেম আর শুধু অনুভূতির বিষয় থাকে না; রূপ নেয় প্রতিদিনের একটি সচেতন সিদ্ধান্তে। দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কে ভালোবাসা মানে অনুভূতির ওঠানামার মধ্যেও সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়ার মানসিকতা।
রাগের মুহূর্তে নিজেকে সংযত রাখা, ভুল-বোঝাবুঝির সময় তাড়াহুড়োতে সিদ্ধান্ত না গ্রহণ কিংবা ব্যস্ততার মাঝেও প্রিয়জনের খোঁজ নেওয়া—এসব ছোট ছোট সিদ্ধান্তই প্রেমকে স্থায়িত্ব দেয়। এমন সিদ্ধান্তের মধ্যে লুকিয়ে থাকে দায়িত্ববোধ, ধৈর্য এবং পারস্পরিক সম্মান। সময়ের সঙ্গে আবেগের তীব্রতা কমা সম্ভব, উত্তেজনা বদলে যেতে পারে অভ্যস্ততায়; কিন্তু থেকে যায় এই সম্পর্কে অটুট থাকার, একসঙ্গে পথ চলার এবং সুখ-দুঃখের বাস্তবতায় সম্পর্ককে সযত্নে আগলে রাখার সিদ্ধান্ত।
ভালোবাসার নামে নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং স্বাধীনতার সম্মান টেকসই প্রেমের অন্যতম শর্ত। প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব মতামত, স্বপ্ন, বন্ধু, পছন্দ এবং ব্যক্তিগত সময় থাকার অধিকার আছে। সম্পর্কের ভেতর এই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে অস্বীকার করা হলে ভালোবাসা ধীরে ধীরে চাপ ও বাধ্যবাধকতায় রূপ নেয়, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় স্বাভাবিক প্রবাহ। টেকসই প্রেমের জীবন মানে একে অপরের সীমারেখা বোঝা এবং তা আন্তরিকভাবে সম্মান করা। কোথায় থামা চাই, কখন পাশে থাকতে হবে আর কখন একটু জায়গা ছেড়ে দেওয়া জরুরি—এই সংবেদনশীল বোধ সম্পর্ককে ভারসাম্যপূর্ণ রাখে। সীমারেখার প্রতি সম্মান না থাকলে সম্পর্কের মধ্যে অস্বস্তি, বিরক্তি ও দূরত্ব তৈরি হয়। অতিরিক্ত ঈর্ষা, সন্দেহ কিংবা দখলদার মনোভাব ধীরে ধীরে ভালোবাসাকে বিষাক্ত করে তোলে। ভালোবাসা যেখানে প্রশ্নবিদ্ধ হয় প্রতিটি পদক্ষেপে, সেখানে নিরাপত্তাবোধ নষ্ট হয়ে যায়। বিপরীতে, যেখানে সম্মান ও আস্থা থাকে, সেখানে মানুষ নিজেকে প্রকাশ করতে পারে নির্ভয়ে; আর সেই নিরাপত্তাই ভালোবাসাকে গভীর করে।
বিশ্বাস ছাড়া কোনো সম্পর্ক দীর্ঘদিন টিকতে পারে না। বিশ্বাস কখনো এক দিনে তৈরি হয় না; এটি গড়ে ওঠে সময়, আচরণ ও ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে। কথা ও কাজের মিল, প্রতিশ্রুতি রক্ষা এবং কঠিন সময়ে পাশে থাকার অভ্যাস বিশ্বাসকে শক্ত ভিত্তি দেয়। আবার বিশ্বাস একবার ভেঙে গেলে তা পুনর্গঠন করা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়, যদি উভয় পক্ষ দায় স্বীকার করে, ধৈর্য ধরে এগোয় এবং আন্তরিকভাবে পরিবর্তনের চেষ্টা চালায়।
দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের মধ্যে অনেক সময় আমরা নিজের চাহিদা পেছনে রেখে সঙ্গীর জন্য জীবন কাটাই। যেমন চাকরি ত্যাগ করে সন্তান জন্মদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া বা সঙ্গীর ক্যারিয়ার সাপোর্ট করা। এতে সমস্যা নেই তেমন; তবে আগে নিজের কাছে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন—সত্যিই কি এটি আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ? এরপর এ নিয়ে সঙ্গীর সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করা চাই। সম্পর্কের শুরুতেই দুজনের জীবনের চাওয়াগুলো সব সময় অভিন্ন হয় না। তাই প্রয়োজন প্রকাশ করতে দ্বিধা থাকা অনুচিত। কেননা, সম্পর্ক অনেকটা ইকোসিস্টেমের মতো। যত্ন না নিলে তা দূষিত হতে পারে; রাগ, অপরাধবোধ, অমীমাংসিত ঝগড়া ও হতাশা সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করে। টেকসই প্রেম মানে সম্পর্কের মধ্যকার এসব আবর্জনা কমানো। ছোটখাটো ঝগড়া এড়ানো, দরকারে ক্ষমা করা এবং এমন আচরণে মন দেওয়া, যা পরস্পরকে সত্যি সুখী করে।
ভালোবাসাকে শুধু উপহার আদান-প্রদান বা বিশেষ দিনে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। প্রকৃত টেকসই সম্পর্ক গড়ে ওঠে প্রতিদিনের ছোট ছোট যত্নের মধ্য দিয়ে। ব্যস্ত জীবনের মধ্যে একসঙ্গে খাওয়ার সময়, দিনের শেষে ছোট একটি ফোনকল কিংবা নীরবে পাশে বসে থাকা—এসব সাধারণ মুহূর্তই সম্পর্ককে শক্তিশালী করতে পারে। টেকসই প্রেমের জীবনে নিজের অস্তিত্ব মুছে ফেলার প্রয়োজন নেই; বরং সুস্থ সম্পর্ক গড়ে ওঠে দুজন পূর্ণ মানুষকে নিয়ে। তাই পরস্পরের মাঝেই রাখা চাই ‘নিজের জন্য সময়’। নিজের মানসিক ও শারীরিক যত্ন, নিজ সীমা বোঝা, শখ ও স্বপ্নকে গুরুত্ব দেওয়া—এসব সম্পর্ককে ভারসাম্যপূর্ণ রাখে। জানা কথা, যে মানুষ নিজেকে সম্মান করতে জানেন, তিনি সম্পর্ককেও মর্যাদা দিতে সক্ষম। তাই একে অপরকে প্রাধান্য দেওয়া মানেই স্বাতন্ত্র্য হারানো নয়; বরং এটি সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার একটি প্রক্রিয়া।
ডিজিটাল যুগে বদলে গেছে প্রেমের ভাষা। মেসেজ, ভিডিও কল এবং সোশ্যাল মিডিয়া অনেকের জন্য সম্পর্ককে সহজ করেছে; কিন্তু এসবের ফলে ভুল-বোঝাবুঝি, নজরদারি বা তুলনার ফাঁদে পড়ার ঝুঁকিও বেড়েছে। তাই সচেতন থাকা চাই অনেক বেশি।
‘কায়েস যেমন লাইলির জন্য লভিলো মজনু খেতাব, যেমন ফরহাদ শিরির প্রেমে হয়ে উঠেছিল দেওয়ানা বেতাব’—কাজী নজরুল ইসলাম বহুদিন আগেই লিখে গেছেন প্রেমে দেওয়ানার কথাটি। কিন্তু শুধু দেওয়ানা হওয়া যথেষ্ট নয়; প্রেমকে টিকিয়ে রাখতে হয় নানা শৃঙ্খলা মেনে। ভালোবাসা যদি একটি গাছের মতো হয়, তবে তা বাঁচাতে লাগে নিয়মিত পানি, আলো ও যত্ন। সময়ের ঝড়ে পাতা ঝরে যেতে পারে; কিন্তু শিকড় যদি শক্ত থাকে, প্রেম হয়ে ওঠে গভীর ও স্থায়ী।
মডেল: তাজরিয়ান ও সায়েম
মেকওভার: পারসোনা
ওয়্যারড্রোব: বিশ্বরঙ
ছবি: কৌশিক ইকবাল
