যাপনচিত্র I ভাবনা-অভিষেক ভালোবাসা
সংগীত পরিচালক অভিষেক ভট্টাচার্য। গেল বছর মুক্তি পাওয়া ৬টি চলচ্চিত্রের পাশাপাশি ডজনখানেক ফিকশনে মিউজিক করেছেন। অ্যালবাম ও বিজ্ঞাপনেও ব্যস্ত। খ্যাতি আছে গায়ক হিসেবে। তার জীবনসঙ্গী সুতপা মজুমদার ভাবনা পুরোদস্তুর করপোরেট লেডি। পাশাপাশি বেসরকারি টেলিভিশনে প্রডিউসার হিসেবে কর্মরত। এই যুগলের একান্ত জীবনে উঁকি দিলেন নাঈমা তাসনিম
ছুটির দিনে ভাবনা বিছানা ছাড়েন সবার আগে। কিছুটা সময় নিজের মতন কাটিয়ে, নাশতা তৈরিতে শাশুড়িকে সাহায্য করেন। এদিকে অভিষেক ছুটির দিনে একটু বেলা পর্যন্তই ঘুমান। ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত। আদাজল খেয়ে, গলা সেধে শুরু হয় তার দিন। সকালের পাতে রুটি, ভাতের সঙ্গে হালকা সবজি কিংবা ডিম পছন্দ ভাবনার। এমন দিনে অভিষেকের পছন্দ পরোটা কিংবা খিচুড়ি। কথার ফাঁকে জানাচ্ছিলেন, রাজধানীর মোহাম্মদপুরে তাদের বাড়ির পাশেই পাওয়া যায় বিশেষ সুস্বাদু চিকেন স্যুপ। মাঝেমধ্যে সেখান থেকে স্যুপ আনিয়ে রাখেন।
ছুটির দিনের পুরোটা সময় চেষ্টা করেন অফিসের কাজ দূরে রাখার। কেননা উভয়েই ভীষণ ব্যস্ত সময় পার করেন সপ্তাহের অন্য দিনগুলোতে। প্রাতরাশ সেরে অভিষেক আবার একটু সুযোগ খোঁজেন বিছানায় গা এলিয়ে দেওয়ার; কিন্তু ভাবনা বুঁদ হন বইয়ে। শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ পড়তে তার ভীষণ ভালো লাগে। অভিষেকও পড়তে ভালোবাসেন; তবে ঘরানা একটু আলাদা। তার পছন্দের লেখক তালিকার শীর্ষে মারিও পুজো, জে আর আর টলকিন। স্নানের আগে পছন্দের আর্টপিসগুলো নিজ হাতে পরিষ্কার করেন ভাবনা। দুজনেই ভালোবাসেন আর্টপিস কালেক্ট করতে। এই আগ্রহ এসেছে মূলত অভিষেকের মায়ের কাছ থেকে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ঘুরে মুখোশ সংগ্রহ করতে ভালোবাসেন ভাবনার শাশুড়ি।
ছুটির দিনের মধ্যাহ্নভোজে অভিষেক চান মায়ের হাতের পোলাও, রোস্ট, কষানো মাংস। স্ত্রীর হাতের স্পেশাল আলু পোস্তের কথা বলতেও ভুললেন না। একেবারে ছকে বাঁধা জীবনের বাইরে চলে যেতে ভালোবাসেন দুজনেই। যৌথ পরিবারে থাকেন তারা। অবসর দিনে তাই পরিজনের সঙ্গে, এক টেবিলেই তিন বেলার আহার সারার চেষ্টা করেন। দুপুরের পাতে একদম সহজ রেসিপি একঘেয়ে লাগে অভিষেকের; তাই মুখরোচক সুস্বাদু খাবার টেবিলে সাজান তার স্ত্রী ও মা।
দুপুরের খাবার শেষে ঘুরতে বের হয় এই যুগল। বেশির ভাগ সময় ভাবনাই ঠিক করেন গন্তব্য। হয়তো সিনেমা দেখতে কিংবা এক্সিবিশন অথবা কনসার্টের উদ্দেশে একত্রে বের হওয়া চাই। এমনই এক কনসার্টে পরিচয় দুজনের। সময় গড়িয়ে তা প্রণয়ে রূপলাভ। অভিষেকই প্রথম জানিয়েছিলেন ভালোবাসার কথা। ভাবনাও তত দিনে প্রেমে পড়েছিলেন। দুজনের বাড়িতেও প্রথম কথা বলেন অভিষেক। টুকটাক মান-অভিমানের পালা এলে, সরিটাও প্রথমে বলেন অভিষেক। বিয়ের পরে ভালোবাসার সংজ্ঞা জানতে চাইলে ভাবনা বলেন, ‘দায়িত্ব, একে অন্যের পরিপূরক হয়ে থাকা।’
বিশেষ দিনে শাড়ি পরতে ভালোবাসেন তিনি। তবে বেশির ভাগ সময়ে আরামদায়ক ও সহজ পরিধেয় পোশাকই পছন্দ। অভিষেকের দেওয়া যেকোনো উপহার তার কাছে স্পেশাল। ক্যানভাসের ক্যামেরায় যে হলুদ শাড়ি পরে দাঁড়ালেন, সেটিও স্বামীর দেওয়া। অন্যদিকে, অভিষেক ডেনিমের ফ্যান। অনুষ্ঠান যা-ই হোক, ডেনিম তার পরা চাই; প্যান্ট কিংবা শার্ট। ভালোবাসেন ঘুরে বেড়াতে, দুজনেই। সম্প্রতি গিয়েছিলেন বগুড়ায়, বন্ধুদের সঙ্গে। দেশের বাইরে আলাদা ঘুরলেও বিয়ের পর প্রথমবার একত্রে গিয়েছিলেন মানালিতে, মধুচন্দ্রিমায়। ইচ্ছা আছে শিগগির থাইল্যান্ডে ঘুরতে যাওয়ার।
ছুটির দিনের রাতে প্রায়শই দাওয়াত থাকে। এড়ানো সম্ভব নয়, এমন দাওয়াত প্রাধান্য পায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে। দাওয়াতে ভারী খাবার ভাবনা এড়িয়ে গেলেও, পারতপক্ষে অভিষেক বাদ দেন না কিছুই! বাড়ি ফিরে দুজনে বসে যান সিরিজ কিংবা সিনেমা দেখতে। দুজনের পছন্দের জনরা আলাদা হলেও মাঝেমধ্যে পরস্পরকে সঙ্গ দেন। অভিষেক জানান, ভাবনার চয়েজ অব সিরিজ বেশ ভালো। থ্রিলার পছন্দ। অভিষেকের ভালো লাগে মিস্ট্রি, মিথোলজি ও অ্যাকশন জনরা। মাঝরাতে সিরিজ দেখার সময় খিদে পেলে ঝটপট বানিয়ে নেন রামেন। ঘুমোতে বেশি দেরি হলে মাঝেমধ্যে ফ্রোজেন ফুডও থাকে বাছাই তালিকায়।
চা-কফির অভ্যাস অভিষেক কিংবা ভাবনা—কারোরই নেই তেমন। তবে শহরের নতুন ক্যাফেতে একটু ঢুঁ মারতে ভালো লাগে ভাবনার; তাতে অভিষেকও সুযোগ পেলে সঙ্গ দেন। ছুটির দিনে নিয়মমাফিক খাবার না খেলেও অন্যান্য দিন পুষিয়ে নেন তারা। হাঁটতেও ভালোবাসেন, এতে কার্ডিও হয়ে যায়। ভাবনার পরিকল্পনা আছে শিগগির ইয়োগায় জয়েন করার। বাড়ির কাজ মোটাদাগে তিনি দেখভাল করলেও গলায় নেই একদম বিরক্তির স্বর। জানালেন, অভিষেককে কোনো কিছু করতে বললে তিনিও আন্তরিকতার সঙ্গে সাড়া দেন। অভিষেকের আরেকটি লুকায়িত প্রভিতা রয়েছে; ছবি আঁকতে ভালোবাসেন। ভাবনাও আশ্চর্য হয়েছেন এত দিন পর এ তথ্য জেনে। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী অভিষেক মাঝেমধ্যে রান্নাও করেন।
ভাবনার বেড়ে ওঠা কুষ্টিয়ায়। ছোটবেলায় পুকুরের টলটলে জলে স্নানের স্মৃতি খুব মনে পড়ে। ছোটবেলায় চকলেট আইসক্রিম ভীষণ ভালোবাসতেন। অভিষেকের বেড়ে ওঠা ঢাকাতেই। ছোটবেলা থেকে মায়ের হাতের খিচুড়ি, কষানো মাংস তার ভীষণ প্রিয়। খাবারে কিংবা ফিল্ম দেখার বেলায় কিছু অমিল থাকলেও আলাপের কদিনের মাঝেই টের পেয়েছিলেন, জীবন দেখার ক্ষেত্রে কতটা মিল দুজনের! তাই খুব একটা সময় নেননি গাঁটছড়া বাঁধতে। তিন বছর ধরে প্রেম, বন্ধুত্ব ও আস্থা অটুট রয়েছে তাদের সংসারে। পাঁচ বছর পর নিজেদের দেখতে চান আরও গভীর প্রেমে।
অভিষেক জানালেন, পরিবারে নতুন সদস্য আনতে চান আগামী দিনে। বাবা হিসেবে দায়িত্ব নিতে চান। সাপোর্ট করতে চান স্ত্রীকেও, যাতে ক্যারিয়ার নিয়ে দুশ্চিন্তায় না পড়তে হয় ভাবনাকে। অন্যদিকে ভাবনার ভাষ্য, ‘আমি নিজে যেহেতু টেলিভিশনে প্রযোজক হিসেবে কাজ করি, তাই সামনে আমার কোনো অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে পেতে চাই অভিষেককে।’
ছবি: রনি বাউল
