skip to Main Content

এডিটর’স কলাম I যুক্তি ও আবেগ: ভালোবাসায় ভারসাম্য

মানবসভ্যতায় যেসব বিষয় নিয়ে সবচেয়ে বেশি গবেষণা হয়েছে, অথচ ফলাফলে পৌঁছানো গেছে সবচেয়ে কম, ভালোবাসা সেই তালিকার শীর্ষে। তবু থেমে নেই এ নিয়ে আলাপ; থামেনি চুলচেরা বিশ্লেষণ

‘ভালোবাসি যারে/ তার হতে কি/ দূরে যেতে পারি আমি/ ভালোবাসি যারে…/ ভালোবাসি যারে/ সারাটি রাত ধরে/ স্বপ্ন আঁখি জুড়ে/ ভালোবাসি যারে…/ আজ ভালোবাসার দিনে/ জানিয়ে দিলাম তোমায়/ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভালোবাসা আজ তোমার তরে…।’ ভাইকিংস ভোকাল তন্ময় আর সলো সিঙ্গার কানিজ সুবর্ণার যুগল কণ্ঠের এ গান চলতি শতকের গোড়ার দিকে মুক্তির পরপরই আমাদের দেশে, বিশেষত তরুণ প্রজন্মের কাছে অনানুষ্ঠানিকভাবে ভ্যালেন্টাইনস ডে অ্যানথেমে পরিণত হয়েছে। বছর ঘুরে যখন আসে ১৪ ফেব্রুয়ারি; পাড়া-মহল্লায়, অলি-গলিতে বাজতে থাকে তুমুল প্রেমের আবহ ছড়ানো গানটি। ভালোবাসা এমনই; সারা বেলা প্রিয় মানুষের ভাবনায় ঘোরগ্রস্ত থাকা। তার মূলে আবেগেরই কুহকী ইন্দ্রজাল, বলা বাহুল্য। কিন্তু শুধু আবেগের ভেলায় চড়ে কোনো সম্পর্ক খুব বেশি দূর এগোতে পারে না বা হয়ে ওঠে না টেকসই। তাই এর সঙ্গে যুক্তির মিশ্রণ ঘটাতে জানাও গুরুত্ববহ।

দুই
খাবার লাগে না ভালো! দুচোখে নামে না ঘুম! মাথার ভেতর সারাক্ষণ ঘূর্ণিপাক শুধুই একজন বিশেষ মানুষকে ঘিরে। এমন উপসর্গ প্রবল হয়ে উঠলে আশপাশের অনেকে বলেন, ‘তুমি তো প্রেমে পড়েছ!’ কিন্তু বিজ্ঞান কী বলে? প্রচলিত আছে, মানবসভ্যতায় যেসব বিষয় নিয়ে সবচেয়ে বেশি গবেষণা হয়েছে, অথচ ফলাফলে পৌঁছানো গেছে সবচেয়ে কম, ভালোবাসা সেই তালিকার শীর্ষে। তবু থেমে নেই এ নিয়ে আলাপ; থামেনি চুলচেরা বিশ্লেষণ। বিশেষজ্ঞরা মোটামুটি একমত, ভালোবাসা এমনই আবেগপূর্ণ অনুভূতি, যা একজন ব্যক্তিমানুষের মস্তিষ্কের প্রায় পুরোটা দখল করে নেয়। সেটির প্রভাব পড়ে ওই মানুষের সকল জাগতিক ও মানসিক ক্রিয়াকর্মে। ফ্রেঞ্চ-আমেরিকান নিউরোসায়েন্টিস, ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর ব্রেন ডায়নামিকস ল্যাবরেটরির সাবেক পরিচালক এবং ২০২২ সালে প্রকাশিত ‘উইয়ার্ড ফর লাভ: আ নিউরোসায়েন্টিস্ট’স জার্নি থ্রু রোমান্স, লস, অ্যান্ড দ্য এসেন্স অব হিউম্যান কানেকশন’ গ্রন্থের রচয়িতা স্টেফানি ক্যাসিওপ্পোর মতে, ‘ভালোবাসা একটি জৈবিক প্রয়োজন। আমাদের ভালো থাকার জন্য শরীরচর্চা, পানি ও খাবার যেমন দরকার; এটিও তেমনই। স্নায়ুবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা সত্যি বলতে পারি, মস্তিষ্কের মধ্যেই ভালোবাসার প্রস্ফুটন ঘটে।’ আর বিপত্তিও সেখানেই! চিন্তাশক্তির অনেকটুকু দখল করে নেওয়ার কারণে ভালোবাসা অনেককে তাড়িত করে বিভ্রান্তিতে; লোপ ঘটায় যুক্তিতর্কের। আবেগই পায় অগ্রাধিকার।
তিন
‘চিন্তা করার চেয়ে বরং মরে যাওয়াকেই শ্রেয় মনে করে বেশির ভাগ মানুষ এবং তারা তা-ই করে!’ উক্তিটি গেল শতকের ব্রিটিশ দার্শনিক ও যুক্তিবিদ বার্ট্রান্ড রাসেলের। চোখ-কান খোলা রাখলেই এ কথার সত্যতা মেলে। শুধু অন্যদের দিকে নয়, নিজের দিকে তাকালেও পাওয়া যায় জবাব। বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলায় অনেকে হাল ছেড়ে দেন; চিন্তাশক্তির ঘটান না প্রয়োগ। ভালোবাসার মতো তীব্র আবেগপূর্ণ ঘটনার ক্ষেত্রে তা স্বভাবতই কয়েক গুণ বেশি মাত্রায়। অথচ কোনো বদ্ধমূল ধারণার মধ্যে আটকে না থেকে, যুক্তিকে জায়গা করে দিতে জানলে, আবেগের সঙ্গে এর ভারসাম্য ঘটাতে পারলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ যেমন সহজ হয়; তেমনি সম্পর্কটির ভালো-মন্দ পরিষ্কার হয়ে ওঠে। জানা কথা, সব সম্পর্ক সমান নয়। আবেগ যতই পরিপূর্ণ বিস্তার ঘটাক, কোনো কোনো সম্পর্ক, বিশেষত ভালোবাসাবাসির বেলায় কেউ কেউ পড়েন নেতিবাচক বন্ধনের ফাঁদে। ফলে এমন সম্পর্ক ঘিরেও সমালোচনামূলক ও বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি জাগরূক থাকা আবশ্যক। ষোলো ও সতেরো শতকের ব্রিটিশ দার্শনিক ফ্রান্সিস বেকন যেমনটা বলেছেন, ‘সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা হলো অন্বেষণের বাসনা, সন্দেহ পোষণের তরে ধৈর্য, ধ্যানের প্রতি অনুরাগ, নিশ্চয়তার পানে ধীরগতিতে অগ্রসরমাণতা, বিবেচনার জন্য প্রস্তুতি, নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে সতর্কতা এবং শৃঙ্খলা নির্ণয় করা; একই সঙ্গে, যেকোনো ধরনের ছলচাতুরীর প্রতি ঘৃণা প্রকাশ।’ এককথায়, সবকিছুকে সকল দিক বিবেচনায় যাচাই করে নেওয়া; যা ভালোবাসার ক্ষেত্রে কখনো কখনো হয়তো একটু বেশিই প্রযোজ্য।

চার
মানুষমাত্রই আবেগপ্রবণ। আর তা সময়ে সময়ে নানা দিকে নেয় বাঁক। জীবন যেহেতু বড় নাট্যমঞ্চ, তাতে নিয়মিত নতুন নতুন নাটকীয়তা যুক্ত হয়। চাইলেই সব সময় সেগুলোর প্রভাব থেকে বাঁচানো যায় না নিজেকে। তবে যুক্তির ওপর ভরসা করতে জানলে কোনো কোনো বিপর্যয় কখনো কখনো এড়ানো সম্ভব। আর আগে থেকে নিজেকে যুক্তিবাদী মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে জানলে মোকাবিলা করা সম্ভব নানা প্রতিকূলতা। এমন সব মুহূর্তে আবেগ ও যুক্তির দ্বৈরথ প্রবল হয়ে উঠতে পারে। কোনো মানুষের পক্ষেই অবশ্য শতভাগ আবেগাত্মক কিংবা শতভাগ যুক্তিপূর্ণ হয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব নয়। তাই উভয় ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ছাড় দিয়ে এ দুয়ের মধ্যে যথাযোগ্য ভারসাম্য তৈরি করে নেওয়া শ্রেয়। ভালোবাসার বেলায় তা হয়তো অন্য অনেক বিষয়ের তুলনায় যথেষ্ট দুরূহ; কিন্তু অসাধ্য নয়। নিজে নিজে প্রয়াস চালানো যদি ফলপ্রসূ না হয়, বিশেষজ্ঞদের দ্বারস্থ হওয়াতে মিলতে পারে সমাধান।

পাঁচ
যুক্তিকে অধিক গুরুত্ব দিতে গিয়ে আবেগের প্রতি কোনো অবহেলা করা কিংবা আবেগের তোড়ে ভেসে যাওয়ার বেলায় যুক্তির প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো—কোনোটাই মঙ্গলজনক নয়। জীবনে দুয়েরই প্রয়োজন ভীষণ। তাই উভয়ের মধ্যকার ভারসাম্য জরুরি। তাহলে ভালোবাসা পেতে পারে প্রকৃত পূর্ণতা। শান্তিময় জীবনের জন্য যার নেই বিকল্প। মৌসুমী ভৌমিক যেমনটা গেয়েছেন, ‘যদি ভালোবাসা না-ই থাকে/ শুধু একা একা লাগে;/ কোথায় শান্তি পাব, কোথায় গিয়ে/ বলো কোথায় গিয়ে…।’
ভালোবাসা তথা জীবন পূর্ণতা পাক সবার। শুভকামনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top