এডিটর’স কলাম I অন্তরে কোমলতা
‘আপনি কোমল হৃদয়ের অধিকারী মানেই আপনার মধ্যে কোনো শক্তি নেই, বিষয়টি কিন্তু তা নয়। কেননা, মধু ও দাবানল—উভয়ের রংই সোনালি’
প্রকৃতিতে বসন্ত যখন, চিরচেনা ফুলের পাশাপাশি অগুনতি নাম না জানা বুনোফুলে চারপাশ একাকার। যেদিকেই চোখ পড়ে, রংবৈচিত্র্য আর সুবাসে কঠোর প্রাণও ছুঁয়ে যায় কোমলতার স্পর্শ। অন্তরে এই পেলবতার তাৎপর্য ধারণ করতে জানলে জীবন হয়ে ওঠে স্নিগ্ধ, সুমধুর। আর তা ব্যক্তিজীবনের গণ্ডি পেরিয়ে, সমগ্র মানবজাতির জন্য বয়ে বেড়ায় সুন্দর ও সাবলীল দর্শনের আভা।
দুই
পৃথিবীর পথে-প্রান্তরে লুকিয়ে থাকে নানা উপাদান। কোনো কোনোটি আক্ষরিকভাবে; কিছু আবার রূপকার্থে। কিছু কিছু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য; কোনো কোনোটি অনুভবযোগ্য। ছড়ানো-ছিটানো এমন হাজারো অনুষঙ্গ থেকে আবর্জনার স্তর সরিয়ে প্রকৃত মণিমুক্তা নিংড়ে নিতে জানেন কেউ কেউ। তারাই হয়ে ওঠেন সত্যিকারের সফল মানুষ। কোনটি গ্রহণীয় আর কোনটি বর্জনীয়, সেই সিদ্ধান্ত সঠিকভাবে নিতে হলে শুধু মস্তিষ্কের নয়, অন্তরের ওপরও রাখতে হয় ভরসা। যুক্তিতর্কের নিক্তির সঙ্গে সমান মর্যাদায় জায়গা দিতে হয় আবেগ আর অনুভূতিকে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, যারা কোমল হৃদয়ের অধিকারী, তাদের পক্ষে এমন জহুরি হয়ে ওঠা সহজতর।
তিন
প্রখ্যাত ইরানি চলচ্চিত্রকার আব্বাস কিয়ারোস্তামির ব্যক্তিজীবনে এক অদ্ভুত ধরনের অভ্যাস ছিল। সাধারণত সারাক্ষণ তিনি সানগ্লাস পরে থাকতেন। এ প্রসঙ্গে একবার এক আন্তর্জাতিক সাংবাদিক রসিকতা করে তার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, গোসল করার এবং ঘুমোনোর সময়ও তিনি চোখে রোদচশমা সেঁটে রাখেন কি না। গভীর জীবনবোধী ওই সৃজনশীল ব্যক্তি সেই রসিকতার স্বর ধরতে পেরে নেতিবাচক অর্থে নেড়েছিলেন মাথা; তবে সঙ্গে সঙ্গে এ-ও জানিয়ে দিয়েছিলেন, পৃথিবীকে একটু কোমল চোখে দেখতে পারার প্রয়াস থেকেই তার ওই সানগ্লাস পরে থাকার অভ্যাস। হাস্যরসের মোড়কে এমন অন্তর্নিহিত জীবনদর্শনের বয়ান তিনি দিলেও জানা কথা, নরম মনের মানুষদের বেশির ভাগ সমাজই একটু খাটো চোখে দেখে। ধারণা করা হয়, এমন ব্যক্তিদের পক্ষে যেহেতু খুব একটা কঠোর হওয়া সম্ভব নয়; তাই আধুনিক, যান্ত্রিক দুনিয়ায় তাদের টিকে থাকা মুশকিল। অথচ শুধু কিয়ারোস্তামি কিংবা তার চলচ্চিত্রগুলোই নয়; আরও অনেক মহামানবের জীবন ও কর্মে নজর রাখলে আমরা দেখতে পাই, তারা নিজ নিজ অন্তরের পেলবতায় পৃথিবীকে এমন ঋদ্ধ করে গেছেন, ফলে অন্যদের পক্ষেও জীবনযাপন হয়ে উঠেছে আরও সুন্দর ও অর্থময়। ইসলাম ধর্মে এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.), যিনি ছিলেন ভীষণ নরম হৃদয়ের অধিকারী। সকল মানুষের প্রতি তিনি কোমল আচরণ করতেন। পবিত্র কোরআনের সুরা আল ইমরানের ১৫৯ নং আয়াতে রয়েছে: ‘(হে নবী,) আল্লাহর রহমতে তুমি তাদের প্রতি কোমল হৃদয় হয়েছিলে; যদি তুমি রূঢ় ও কঠোরচিত্ত হতে, তবে তারা তোমার আশপাশ থেকে সরে পড়ত। সুতরাং তুমি তাদের ক্ষমা করো এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং কাজকর্মে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করো।’ হাদিস গ্রন্থ মুসলিমের এক বর্ণনায় এসেছে, একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত আয়েশা (রা.)-কে বলেন, ‘কোমলতাকে নিজের জন্য বাধ্যতামূলক করে নাও এবং কঠোরতা ও নির্লজ্জতা থেকে নিজেকে রক্ষা করো। কেননা যে জিনিসের মধ্যে নম্রতা ও কোমলতা থাকে, সেই নম্রতা ও কোমলতাই তার সৌন্দর্য বৃদ্ধির কারণ হয়। আর যে জিনিসে কোমলতা থাকে না, তা দোষণীয় হয়ে পড়ে।’ (মিশকাত ৫০৬৮)
চার
‘আপনি কোমল হৃদয়ের অধিকারী মানেই আপনার মধ্যে কোনো শক্তি নেই, বিষয়টি কিন্তু তা নয়। কেননা, মধু ও দাবানল—উভয়ের রংই সোনালি।’ এই উদ্ধৃতি আমেরিকান লেখক, কবি, স্বপ্নবাজ এবং সৃজনশীল লেখালেখির প্রশিক্ষক ভিক্টোরিয়া এরিকসনের। রঙের ভেলকিতে বিভ্রান্ত না হয়ে, কোনটি মধু আর কোনটি দাবানল—তা চিনতে এবং সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারা বিচক্ষণতার পরিচায়ক। সহজ কথায়, প্রয়োজনে কোমলতার সঙ্গে মেশানো চাই কঠোরতার নির্যাস।
পাঁচ
চলছে পবিত্র রমজান মাস। ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের জন্য বহু প্রার্থিত, সিয়াম সাধনার উপলক্ষ। শারীরিক কষ্টের ভেতর দিয়ে মনের কালিমা ধুয়েমুছে নেওয়ার সুযোগ। এককথায়, কোমল হৃদয়ের অধিকারী তথা মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হওয়ার এক চমৎকার জীবনচর্চা।
ক্ষতিকর কঠোরতা দূর হোক সবার অন্তর থেকে। ফুলের মতো কোমল অন্তরের অধিকারী হোক সবাই।
শুভকামনা।
