মনোজাল I অকেশন ইজ ইউ
ফ্যাশন কি শুধু উৎসবের জন্য, নাকি নিজেকে উদ্যাপনের এক নীরব ঘোষণা? যদি উপলক্ষই হয়ে ওঠে ‘আমি’, তবে প্রতিদিন হোক রেড কার্পেট লুক
সিন্ডারেলা যখন রাজপুত্রের নিমন্ত্রণ পেয়েছিল, তখন সে যতটা না খুশি হয়েছিল, তার চেয়ে বেশি পড়ে গিয়েছিল চিন্তায়। কেমন পোশাকে সাজাবে নিজেকে? যখন সে পেয়ে গেল প্রিন্সেস গাউন আর কাচের জুতা, তখন ভার নামল মাথা থেকে। এমনটাই হয়। বেশির ভাগ মানুষ নিজের সেরা পোশাক, জুতা, অনুষঙ্গ তুলে রাখেন বিশেষ দিনের জন্য। বাকি দিন যেনতেন! কিন্তু সব সময় কি সেদিন আসে? অনেক সময় দেরি করতে করতে ট্রেন্ডের বাইরে চলে যায় যত্নে তুলে রাখা সবকিছু। আবার কখনো মাপে ছোট হয়ে যায়। কখনো আসন্ন উৎসব অধরাই থেকে যায় কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত কারণে। আফসোসের মেঘ আরও গাঢ় হয় তখন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি রিল কয়েক দিন ধরে ইন ট্রেন্ড। উর্দু ভাষায় তাতে শোনা যায়, ‘বাদ মে দিল নেহি কারতা’, অর্থাৎ পরে আর ইচ্ছাটাই থাকে না। শেয়ার করেছেন অগুনতি নেটিজেন। কারণ, এখনো অনেকে সেই পারফেক্ট টাইমিংয়ের অপেক্ষায় থেকেই পার করেন সারাটা জীবন। শখ জমা থাকে মনের গোপন কুঠুরিতে। একদিন তালা খোলা হবে—সেই স্বপ্নে কাটে দীর্ঘ দিবস, দীর্ঘ রজনী। কারও সেই বাসনা পূরণ হয়; কারও হয় না কখনোই। আফসোস জমে জমে হয়ে ওঠে পাহাড়সম।
আনন্দই বাঁচিয়ে রাখে মানুষকে। মন রাখে চাঙা। এই আনন্দের স্পর্শ পেতে নিজেকে গুরুত্ব দেওয়া চাই সবার আগে। যেখানে নিজেই উপলক্ষ। নিজেকে ঘিরেই উৎসব। প্রখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনার জর্জিও আরমানির একটি বিখ্যাত উক্তি, ‘নেভার লেট দ্য ক্লথস ওয়্যার ইউ। ইউ আর দ্য ওয়ান হু’স ওয়ারিং দেম।’ নিজে হাজার রকম পোশাক নকশা করা এই ব্যক্তিও চাননি, পোশাকে হারিয়ে যাক মানুষ।
ফ্যাশন শুধু একটি উপলক্ষ ঘিরে তৈরি হয় না। কারণ, ফ্যাশন যতটা সামাজিক, তার চেয়ে অনেক বেশি ব্যক্তিগত। ব্যক্তিত্ব, মূল্যবোধ, পরিচয়—সব মিলিয়েই তৈরি হয়। দর্শন, যুক্তিতর্ক—সবই মিশে যায় সেখানে। পোশাকে স্বতন্ত্রতা প্রকাশ পায়। তাই ফ্যাশন হলো নিত্যদিনের। বেশ খানিকটা প্রয়োজনেরও বলা যেতে পারে।
নিজের চাহিদাকে প্রাধান্য দিয়ে পোশাকের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বর্তমান সময়ের ফ্যাশনিস্তারা বিশেষ দিবসের অপেক্ষা না করে মর্জিমতো সেজে নিচ্ছেন। জীবনটাকেই উৎসব মনে করছেন। রেড কার্পেটের অপেক্ষায় রিহার্সাল নয়; তাই বিশেষ ক্ষণ এলো কি না, তা এখন ভোগাচ্ছে কম। সবক্ষেত্রে যে সামাজিকভাবে প্রশংসিত হয়, তা নয়। কিন্তু সেসব নিয়েও খুব বেশি ভাবতে দেখা যায় না স্বাধীনচেতাদের। মনের চাহিদাই সেখানে সব। বিষাদের চিরচেনা রং গাঢ় নীল। সেই বিষাদগ্রস্ত মনকেই প্রাণবন্ত করে তুলতে কালার প্যালেটের সফট শেড ব্যবহার করতে দেখা যায় অনেককে। এ বিষয়ে যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায় সাইকোলজিস্ট অ্যাঞ্জেলা রাইটের ‘কালার অ্যাফেক্টস সিস্টেম’ গ্রন্থে। তিনি বর্ণনা করেছেন, কীভাবে রঙের উজ্জ্বলতা ও দৃঢ়তা মানুষের মানসিক অবস্থাকে প্রভাবিত করে। তাই উপলক্ষ শুধু বিশাল কিছু হতে হবে, এমন নয়। ঈদ, পূজা, পয়লা বৈশাখ কিংবা কারও বিয়ে-বউভাত হতেই হবে—এমন ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। নিজস্ব উপলক্ষও হতে পারে সাজগোজের কারণ।
ভ্যালেন্টাইনস ডেতে প্রেমিক-প্রেমিকার জন্য তৈরি হওয়ার চল পুরোনো। কিন্তু দিনটি যে শুধু কাপলদের জন্য, সেই ধারণা থেকে ইতিমধ্যে বেরিয়ে এসেছেন অনেকে। যার ধারাবাহিকতায় গ্যালেন্টাইন ডে এসেছে আলোচনায়। তরুণীদের দেখা যাচ্ছে বন্ধুর সঙ্গে মিলে পার্টি আয়োজন করতে। গোলাপি, লাল, বেগুনিতে সাজছেন কেউ কেউ। ফ্যাশন বাজারে ক্যাপসুল কালেকশনের গুরুত্ব বাড়ার পেছনে আছে এই ফ্যাশনে নিজস্বতার মনোভাব। ইনস্টাগ্রামে খোঁজ পাওয়া যায় এমন গার্লস পার্টির, যা আয়োজন করা হয় শুধু সেসব পোশাক পরিধানের জন্য, যেগুলো মানাবে এমন কোনো জুতসই প্ল্যাটফর্ম খুঁজে পাননি ফ্যাশন-সচেতনেরা। তাই নিজেরাই তৈরি করেছেন উপলক্ষ। খেয়ালখুশিমতো তৈরি হয়েছেন প্রিয় পোশাকে।
এসবের জোয়ারে নিজেকে গুরুত্ব দেওয়ার ধারায় রুটিন মেনে তৈরির চাপ কমে আসছে। উৎসব মানেই জমকালো—এমন আবশ্যকতা কমেছে। সেখানে প্রাধান্য পাচ্ছে ব্যক্তির নিজস্বতা। নিজের মন, শরীর, চাহিদা আর বাস্তবতা।
সারাহ্ দীনা
মডেল: বর্ণ, শাকিরা রিয়া ও ইনাবা
মেকওভার: পারসোনা
ওয়্যারড্রোব: সাহার রহমান কতুর
ছবি: জিয়া উদ্দীন
