ফিচার I নজরবন্দী নয়নাভিরাম
কোয়াইট লাক্সারিতে দীর্ঘদিন মুগ্ধ ছিল ফ্যাশন বিশ্ব। স্ট্রিট হোক কিংবা হাই ফ্যাশন—সবখানেই মিউটেড টোন, নিউট্রাল শেডের রাজত্ব। ২০২৬ সাল বদলে দিয়েছে সেই চিত্রপট। এবার রঙের খেলায় বুঁদ সব। ব্লান্টের জায়গা নিয়েছে বোল্ড
লুক অ্যাট মি কালার প্যালেট এসেছে উজ্জ্বলতম রঙের সমাহার নিয়ে। যেগুলো মূলত অন্যের মনোযোগ আকর্ষণে সক্ষম। হাই স্যাচুরেশন সমৃদ্ধ। কনট্রাস্টে নিরীক্ষার চূড়ান্ত। কোনো অস্বস্তি ছাড়াই নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়। নেই রাখঢাক। শুধু ট্রেন্ড সেট নয়; মুড শিফট করতেও সক্ষম। ফ্যাশনে সাইকোলজিক্যাল স্টেটমেন্ট বলা চলে। প্যাটেন্ট ফ্যাশন ক্যাটাগরি বলা যাবে না একে। দাপ্তরিক নাম পায়নি কোনো ডিজাইনার কিংবা একাডেমিক ইনস্টিটিউটের কাছ থেকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে পৌঁছে গেছে ফ্যাশন-সচেতনদের কাছে। নামকরণেও সেই জনসাধারণ। এই প্যালেটে আছে ইলেকট্রিক ব্লু, নিয়ন গ্রিন, টমেটো রেড, হট পিংক, ভিভিড ইয়েলো, ডিপ জুয়েল টোনের মতো রং।
ট্রেন্ড ট্রেন
যাপিত জীবনে সোশ্যাল মিডিয়া দিন দিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। শুধু ছবি পোস্টে আটকে নেই; মাই ডে থেকে রিলস—সবখানে নিজের উপস্থিতি জানান দিতে আগ্রহী মানুষের সংখ্যা কম নয়। স্ক্রিনে চোখ রেখে দিনের বড় অংশ পার করেন তারা। রং তাদের নিত্যদিন জড়িয়ে রাখে। ইতিবাচক অর্থেই অন্যের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা চলে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপস্থিতি ফ্যাশন-সচেতনদের আগ্রহী করে এমন রং বেছে নিতে, যা তাদের লুককে আরও আকর্ষণীয় করে তুলবে। একঘেয়েমি বিসর্জিত হতে দিতে চান না। নিজস্বতাও এখানে প্রাসঙ্গিক। রং মানুষকে সুযোগ দেয় নিজেকে প্রকাশ করার। লুক অ্যাট মি প্যালেটে সেই স্বাধীনতা আছে। আবার সলিডেই মানিয়ে নিতে হবে—এমনটাও নয়। প্রিন্ট পারফেক্টেও বইতে পারে রঙের বন্যা।
পাওয়ার পারফরম্যান্স
এই ট্রেন্ডের ইতিহাস ঘাঁটলে খুঁজে পাওয়া যায় পপসম্রাজ্ঞী ম্যাডোনাকে। আশির দশকে সংগীত যখন শুধু আর শোনার নয়, দেখার বিষয়ও হয়ে উঠছে, তখনই লুক অ্যাট মির শুরুয়াত। জেনারেশন এক্স থেকে মিলেনিয়ালস, এমটিভি ছিল সুরের দুনিয়ার সঙ্গে সন্ধির প্ল্যাটফর্ম। আর সেখানেই ম্যাডাম ম্যাডোনা মায়াজাল বুনেছিলেন নজরকাড়া কালার প্যালেটে। নিয়ন পিংক লেইস টেপ, ইলেকট্রিক ব্লু অ্যাকসেসরিজ, হাই-কনট্রাস্ট লেয়ারস দেখা যেত তার লুকে। মিডিয়া স্মার্ট প্রেজেন্স। আত্মবিশ্বাসকে সঙ্গী করে দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পেরেছিলেন। তাতে নারীশক্তি ছিল প্রকট। বিদ্রোহ ছিল ভীষণ রকম। নারীদের সফট এরাকে ম্রিয়মাণ করে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল সেই শক্তিশালী উপস্থিতি। স্ট্রিটওয়্যার হয়ে উঠেছিল পারফরম্যান্স ওয়্যারড্রোব। সেখান থেকে তখনকার তরুণদের নিত্যদিনের পোশাক। আজ, এত বছর পরেও উদাহরণে তাই ম্যাডোনা ম্যাডনেস।
মিউটেড টু ম্যাক্সিমাল
ফ্যাশন বাঁচে চক্রে। ঘুরেফিরে মঞ্চে আসে। পেন্ডুলামের মতো দোলে। ২০১০ সালে বিশ্ব যখন অর্থনৈতিক খরার কবলে, তখন মিনিমালিজম ফিরে এসেছিল। আবার ২০২০ সালের করোনাকালের আকস্মিক ঝড়ের পরে এসেছিল ডোপামিন ড্রেসিং। মুড বুস্টার হিসেবে রঙিন সবকিছুতে মন দিয়েছিলেন ক্রেতা। শুধু যে সুন্দরতাই সেখানে মুখ্য ছিল, তা নয়। ইতিবাচক অনুভূতিও ছিল বিবেচ্য। বোল্ড কালারের ঢেউ তখনই একটু একটু করে রাঙিয়ে দিচ্ছিল সবকিছুকে। আর এ বছরের প্রেক্ষাপট একদম অন্য রকম। বিশ্ব টালমাটাল রাজনৈতিক উচাটনে। বিশ্বনেতাদের ক্ষমতার খেলা, জেন-জি রেভল্যুশন, তেল-বাণিজ্যসহ নানা কিছুতে অস্থিরতা। অদ্ভুত এই সময়ে ডিজাইনাররা যেন পুরোপুরি নিজেদের মধ্যে বুঁদ! চলতি স্রোতের বিপরীতে গিয়ে শোনাতে চাইছেন স্বস্তির গল্প। রাঙিয়ে দিতে চাইছেন ক্রেতাদের মন। গ্লোবাল রানওয়েতে দেখা যাচ্ছে তারই সুর। রং যেন স্টোরিটেলিং টুল। লুই ভিতোঁ তাদের ক্ল্যাসিক সিলুয়েটে নানা রঙের উদ্ভাস দেখিয়েছে, যা চাইলেও উপেক্ষা করা যায় না। চোখ আটকে যায়। প্রাদার হাই স্যাচুরেটেড কোট আনন্দ সঞ্চার করেছে দর্শকদের মনে। সেইন্ট লরেন ডিপ ভারমেলিয়নে উচ্ছ্বসিত। ভ্যালেন্তিনো জুয়েল টোনে অভিজাত। এসবের কোনোটাই ডিজাইনারদের খামখেয়ালি থেকে পাওয়া নয়। ভেবেচিন্তে বেছে নেওয়া হয়েছে। স্টেজ থেকে স্ট্রিট—সবখানে। হোক তা এডিটরিয়াল শট, কিংবা নিত্য দিনযাপন।
বিষয়টি মোটেই শুধু আন্তর্জাতিক নয়; দেশি ফ্যাশনেও আছে এর প্রভাব। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজার সব সময় রং-মাতাল ফুল! এমনকি মিনিমালিজমের শীতল সময়টাতেও। এর পেছনে দেশের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যই মূল। ছয় ঋতুর এই দেশে প্রকৃতি একেক সময় একেক রঙে সাজে। আর ক্রেতারাও প্রকৃতির পরিবর্তনকে প্রাধান্য দিয়ে পোশাক কিনতে ভালোবাসেন। বসন্তে ফুল-পাতা, বৈশাখে চিরায়ত লাল-সাদা আর রোদের রং, গ্রীষ্মে শান্ত শীতল বহমান, আবার বর্ষা আসে নীল নিয়ে। শরতে একদিকে আকাশি, অন্যদিকে দেবীপক্ষের রোশনাই। হেমন্তে সবুজ কিংবা মেটে, আর শীত? তখন সব চিকমিক। কখনো সোনালি তো কখনো রুপালি। কখনোবা গাঢ় সব। এই ধারায় বেশ কিছু রংকে বাঙালি নিজের মতো করে নাম দিয়েছে—রানি গোলাপি, মেহেদি সবুজ, জাম রং, পেস্তা, ময়ূর নীল আছে সেই তালিকায়। এবার যেসবে চোখ আটকে যাবে, সেই তালিকায় আছে এসব রং। মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রং তাই মুখ্য। মেইন ক্যারেক্টার এনার্জি নিয়ে হাজির।
সারাহ্ দীনা
মডেল: আনসা
মেকওভার: পারসোনা
ওয়্যারড্রোব: এরকোল
ছবি: জিয়া উদ্দীন
