সঙ্গানুষঙ্গ I টিক টিক শিক শিক
স্মার্টওয়াচের ভিড়ে যখন যান্ত্রিকতা বেড়ে চলেছে, ঠিক তখনই চিরাচরিত আভিজাত্যের ছোঁয়া নিয়ে ফ্যাশনপ্রেমীদের পছন্দের তালিকার শীর্ষে ফিরে এসেছে ককটেল ওয়াচ। ম্যাক্সিমালিজম-প্রাণিত, দুর্দান্ত
ককটেল ওয়াচ হলো ঘড়ি ও গয়নার একটি শৈল্পিক মিশেল। মূল বিশেষত্ব এর আকার। সাধারণত ডায়াল প্রস্থে ১৮ থেকে ২০ মিলিমিটারের মতো। এই ঘড়িগুলো এমনভাবে নকশা করা, যেন তা দূর থেকে ঘড়ি নয়; বরং একটি ব্রেসলেট বা গয়না মনে হয়। স্ট্র্যাপগুলো সাধারণত সোনা, রুপা বা প্ল্যাটিনামের হয়। এতে হীরা, পান্না বা অন্য কোনো দামি পাথরের কারুকার্য থাকে। কলিন্স ডিকশনারির সংজ্ঞায় একে নারীদের সন্ধ্যাকালীন পোশাকের অনুষঙ্গ বলা হলেও আধুনিক যুগে তা বহু বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যময়।
ককটেল ওয়াচের ইতিহাস জানতে হলে ফিরে যাওয়া চাই প্রায় ২০০ বছর আগের দুনিয়ায়। আঠারো শতকের শুরুর দিকে যখন পুরুষেরা ভারী পকেট ঘড়ি ব্যবহার করতেন, তখন নারীদের জন্য ঘড়ি ছিল অনেকটা বিলাসিতা। প্রথম দিকের হাতঘড়িগুলো আসলে ছিল ব্রেসলেটের ভেতরে বসানো ছোট ছোট ঘড়ি। মজার ব্যাপার হলো, সামরিক বাহিনীর সদস্যরা কবজিতে ঘড়ি পরার সুবিধা বোঝার অনেক আগেই নারীরা একে ফ্যাশন হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
প্রয়োজনের তাগিদে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে নারীদের পোশাকে আমূল পরিবর্তন আসে। ভিক্টোরিয়ান যুগের সেই শক্ত ও ভারী করসেট পরার চল কমতে থাকে। আগে নারীরা তাদের ভারী পকেট ঘড়িগুলো পোশাকের ভাঁজে বা চেইনে ঝুলিয়ে রাখতেন। কিন্তু নতুন ধরনের হালকা পোশাকে ঘড়ি রাখার মতো মজবুত পকেট বা জায়গা ছিল না। ঠিক এই সময়েই নারীদের জন্য একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গে পরিণত হয় রিস্ট-ওয়াচ। পোশাকের ভাঁজে নয়, কবজিতেই সময় দর্শন। শিল্পায়ন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফলে এই সময় ছোট কিন্তু নির্ভরযোগ্য ঘড়ি তৈরি সম্ভব হয়ে ওঠে।
ককটেল সংস্কৃতির উত্থান প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর। তখন মানুষের জীবনযাত্রায় একধরনের মুক্তির আমেজ আসে; বিশেষ করে নারীরা সামাজিক মেলামেশায় বেশ স্বাধীনতা পেতে শুরু করেন। নাচ, অপেরা আর সন্ধ্যাকালীন পার্টি, যা ককটেল পার্টি নামে পরিচিত ছিল, তার জোয়ার শুরু হয়। এই পার্টিগুলোতে পরার জন্য এমন কিছু প্রয়োজন ছিল, যা একই সঙ্গে সময় দেখাবে এবং গয়না হিসেবেও কাজ করবে। গেল শতকের বিশের দশকের আর্ট ডেকো আন্দোলন ককটেল ওয়াচের নকশায় ব্যাপক প্রভাব ফেলে। জ্যামিতিক নকশা, কড়া উজ্জ্বল রং আর পাথরের কাজ দিয়ে তৈরি এই ঘড়িগুলো তখন আভিজাত্যের প্রধান প্রতীকে পরিণত হয়।
ককটেল ওয়াচের বৈচিত্র্যই এর প্রধান আকর্ষণ। এটি নির্দিষ্ট কোনো ছাঁচে বাধা নয়। বিশ শতকের চল্লিশের দশকে যখন বিশ্বজুড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা, তখন রত্নপাথরের অভাব দেখা দিয়েছিল। সে সময় বুলগারির মতো ব্র্যান্ডগুলো পাথর বাদ দিয়ে সোনা বা মেটালকে পেঁচিয়ে সারপেন্টি স্টাইল তৈরি করে, যা আজও জনপ্রিয়। আবার সত্তর বা আশির দশকে যখন রঙিন পাথরের ধারা ফিরে আসে, তখন ককটেল ওয়াচে রুবি, স্যাফায়ার আর পান্নার জাঁকজমক দেখা যায়। এই ঘড়ি কখনো লেদার স্ট্র্যাপে একদম সাধারণ, আবার কখনো হীরায় মোড়া আভিজাত্যের প্রকাশ—এই বহুমুখী রূপই একে চিরযৌবনা করে রেখেছে।
বছর কয়েক ধরে ফ্যাশন দুনিয়ায় ভিন্টেজ পণ্যের প্রতি মানুষের মোহ বাড়ছে। ককটেল ওয়াচ ট্রেন্ডে ফিরে আসার কয়েকটি কারণ রয়েছে; যেমন ফ্যাশন দুনিয়ায় মিনিমালিজমের প্রভাব। ফ্যাশন এডিটর ও ইনফ্লুয়েন্সাররা এখন বড় বড় ভারী ঘড়ির চেয়ে ছোট ও সূক্ষ্ম ঘড়িতে বেশি আগ্রহী। ভোগের মতো ম্যাগাজিনগুলো বারবার এই ঘড়িকে মাস্ট-হ্যাভ অনুষঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে। লিঙ্গ-নিরপেক্ষতাও এর অন্যতম কারণ। আধুনিক ককটেল ওয়াচ এখন শুধু নারীদের নয়; পুরুষদের ড্রেস ওয়াচেও ককটেল ঘরানার ছোঁয়া আর ছোট ডায়ালের ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। সেইকোর মতো ব্র্যান্ডগুলো পুরুষদের জন্য চমৎকার ককটেল ওয়াচ বাজারে এনেছে।
ইনস্টাগ্রাম বা পিন্টারেস্টে ওল্ড মানি অ্যাসথেটিক বা আভিজাত্যপূর্ণ মিনিমাল সাজের জনপ্রিয়তা ককটেল ওয়াচকে নতুন প্রজন্মের কাছে আগ্রহী করে তুলেছে। অনেকে এখন পুরোনো বা ব্যবহৃত ঘড়ির বাজার থেকে সাশ্রয়ী দামে দামি দামি ভিন্টেজ ককটেল ওয়াচ খুঁজে পাচ্ছেন, যা স্টাইল ও সঞ্চয়—উভয় দিকেই লাভজনক।
সেইকো প্রিসেজ ককটেল টাইম: এর মোহনীয় ডায়ালগুলো একেকটি বিখ্যাত পানীয়ের রঙে তৈরি। এটি বর্তমানের সবচেয়ে জনপ্রিয় জেন্ডার-নিউট্রাল ককটেল ওয়াচ।
বুলগারি সারপেন্টি: কবজিতে সাপের মতো পেঁচিয়ে থাকা এই ঘড়ি আভিজাত্যের চূড়ান্ত উদাহরণ।
কার্টিয়ে বেনোয়ার: এর ওভাল বা ডিম্বাকৃতি নকশা এবং সোনার ব্রেসলেটের চাহিদা এখন তুঙ্গে।
টিসো লাভলি: যারা একদম ছোট ও ছিমছাম নকশা পছন্দ করেন, তাদের জন্য এটি সেরা।
শ্যানেল প্রিমিয়ার: গয়না ও ঘড়ির এক অপূর্ব সংমিশ্রণ।
বর্তমান বাজারে প্রধানত পাঁচ ধরনের ককটেল ওয়াচ দেখা যায়-
ব্রেসলেট ওয়াচ: দেখতে একদম ধাতব চেইন বা অলংকারের মতো।
লেদার স্ট্র্যাপ ওয়াচ: অফিসের কাজে বা দিনের বেলায় পরার জন্য বেশ উপযুক্ত।
র্যাপ অ্যারাউন্ড ওয়াচ: কবজিতে দুই বা তিনবার পেঁচিয়ে পরতে হয়।
কাফ ওয়াচ: চওড়া। নকশা অলংকৃত। হাতে পরলে বেশ রাজকীয় দেখায়।
হীরাখচিত বা রত্নখচিত: বিশেষ করে রাতের অনুষ্ঠান বা বিয়ের জন্য তৈরি।
ককটেল ওয়াচ স্টাইলিং
দেশি পোশাকের সঙ্গে বেশ ভালোভাবেই স্টাইল করা যায় ককটেল ওয়াচ। যেমন শাড়ির সঙ্গে একটি মেটালিক বা গোল্ডেন ককটেল ওয়াচ বেশ ভালো মানায়। সালোয়ার স্যুট বা শারারা সেটের সঙ্গেও একই নিয়ম মেনে ককটেল ওয়াচ স্টাইল করা সম্ভব। ভারী গয়না পরলে ঘড়িটি যেন একটু সিম্পল ও মিনিমাল ডিজাইনের হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা শ্রেয়। জিনস ও সাদা টি-শার্টের সঙ্গে একটি ছোট লেদার স্ট্র্যাপের ককটেল ওয়াচ পরলে তা সাধারণ সাজকে করে তুলবে প্রিমিয়াম। আবার ব্লেজার বা অফিসের ফরমাল পোশাকের সঙ্গে স্লিম ব্রেসলেট ঘড়ি খুব রুচিশীল দেখায়। রাতে যদি লিটল ব্ল্যাক ড্রেস বা ককটেল গাউন পরেন, তার সঙ্গে একটি র্যাপ অ্যারাউন্ড ঘড়ি বেশ সুন্দর মানাবে। চাইলে ঘড়ির সঙ্গে দু-একটি সরু ব্রেসলেট মিলিয়ে নেওয়া যেতে পারে।
ফাহমিদা শিকদার
মডেল: দিবা, আনসা ও ইলা
মেকওভার: পারসোনা
ওয়্যারড্রোব: লাভা
ছবি: জিয়া উদ্দীন
