skip to Main Content

ফিচার I মনোক্রোম ম্যাজিক

ফ্যাশনে ট্রেন্ড আসে, যায়। কখনো নিয়ন, কখনো ম্যাক্সিমাল প্রিন্ট, কখনো রেট্রো রিভাইভাল। কিন্তু মনোক্রোম? এক রঙেই আবেদন শতভাগ, অদ্ভুতভাবে সময়কে অতিক্রম করে টিকে থাকে। কেন? জানাচ্ছেন দিলজান নাহার চাঁদনী

একটা রং, আর অনেক অনুভূতি। ফ্যাশনের অন্যতম সহজ সূত্র; বিশেষ করে ছেলেদের। রং নিয়ে যারা খুব একটা খেলতে চান না, এক রঙেই যাদের বাহাদুরি, তাদের জন্য মনোক্রোম। সরল বাংলায় যার অর্থ, এক রঙের আধিপত্য। ফ্যাশনে ট্রেন্ড বদলায়, রং বদলায়; কিন্তু পুরোনো হয় না মনোক্রোমের আবেদন। রঙিন ফ্যাশন ধারার বিপরীতে সটান দাঁড়িয়ে যেন। একই রঙের ভেতর লুকিয়ে থাকা টোন আর টেক্সচারের খেলা। পরিশীলিত এক স্টাইল স্টেটমেন্ট।
কাল্ট ক্ল্যাসিক
একটি রংকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় পুরো লুক। অন্য রঙের সামান্য উপস্থিতি থাকলেও ক্ষতি নেই; তবে গুরুত্ব পাওয়া চলবে না। মূল খেলা এক রঙের। থাকতে পারে সেই রঙের ভিন্ন ভিন্ন আভা; অর্থাৎ, শেড ও টোন। টেক্সচারের সমন্বয় জুতসই। বাড়তি ভাবনার প্রয়োজন নেই মনোক্রোমে। অল্পেই পরিপাটি। চিরচেনা কাল্ট ক্ল্যাসিক। যদিও ফ্যাশনে রং নিয়ে চর্চার শেষ নেই। পুরুষদের ক্ষেত্রেও আছে সমৃদ্ধ ইতিহাস। রঙিন পোশাকে অভ্যস্ত ছিলেন এই তটের রাজা-বাদশারা। নানা সময়ে রঙিন ফ্যাশনে গা বাসিয়েছেন দেশ-বিদেশের পুরুষেরা। মনোক্রোম হেঁটেছে পাশাপাশি। কখনো কম, কখনো বেশি।
উনিশ শতকে কমতে শুরু করে রঙিন ফ্যাশনের গুরুত্ব; বিশেষ করে দাপ্তরিক চাকরিজীবী ও শ্রমজীবী পুরুষেরা ঝুঁকতে শুরু করেন গাঢ় ও সংযত রংগুলোর প্রতি। বাস্তবতার সঙ্গে মানানসই এবং কাজের পরিবেশের উপযোগী পোশাকে প্রাধান্য পেতে থাকে একরঙা পোশাক। শিল্পবিপ্লবের পর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব প্রকট হয়ে ওঠে ফ্যাশনে। গেল শতকের বিশের দশকে পুরুষ মহলে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ‘কালো-সাদা’র আবেদন। ক্লিন কাটের ক্ল্যাসিক স্যুট হয়ে ওঠে পশ্চিমা অভিজাত পুরুষদের নিত্যসঙ্গী। অনেকটা ইউনিফর্মের মতো। সে সময় সীমিত রঙের পোশাক ছিল আধুনিকতার প্রতীক। এরপর নব্বইয়ের দশকে মিনিমালিজম ধারার একচ্ছত্র অংশ হয়ে ওঠে একরঙা এই ফ্যাশন। ফরমালের পাশাপাশি যুক্ত হয় স্ট্রিটওয়্যারে।
রঙিন রানওয়ে
আন্তর্জাতিক ফ্যাশন মঞ্চে বিশেষ নজর কাড়ে মনোক্রোম। ক্রিশ্চিয়ান ডিওর, প্রাদা, লুই ভিতোঁ, জিভাঁশি প্রভৃতি ব্র্যান্ডের রানওয়ের মূল সেগমেন্টগুলো মুখর হয় এক রঙের পোশাকে। সাম্প্রতিক সময়ের উইন্টার ও ফল কালেকশনে মনোক্রোমকে প্রাধান্য দিয়েছে দেশি-বিদেশি ব্র্যান্ডগুলো। এ বছরের জানুয়ারি মাসে ডলশে অ্যান্ড গ্যাবানার ‘দ্য পোর্ট্রেট অব ম্যান’ শীর্ষক ফ্যাশন শোতে হালকা এবং গাঢ়—সব রঙেই তুলে ধরা হয়েছে মনোক্রোম ধারা। লেয়ারিং ফিউশনে প্রাধান্য পেয়েছে কালো, ছাই, বাদামি রং। খেলা হয়েছে নীলের নানা আভা নিয়েও।
সেন্ট লরেন্ট এবং জর্জিও আরমানির এ বছরের শোতেও দেখা গেছে এক রঙের বাহাদুরি। মনোক্রোম লেয়ারিং, বিভিন্ন শেড, টেক্সচারের মিশ্রণ এবং আধুনিক টেইলারিংয়ের সমন্বয় ছিল প্রকাশিত। যেন এটিই পুরুষদের আলটিমেট ফ্যাশন!
মর্মে মনস্তত্ত্ব
এক রঙের শৈলীতে চোখ আটকাবেই। পেছনে আছে গভীর মনস্তত্ত্ব। অস্বস্তি তৈরি করতে পারে রং। চোখ ও মন—দুটোতেই। যদি থাকে রঙের বাড়াবাড়ি। অন্যদিকে অল্প রঙে চোখের শান্তি। মনেও দেয় আরাম, যেন স্বস্তির ছোঁয়া। অর্থাৎ, মনের ওপর রঙের প্রভাব প্রত্যক্ষ না হলেও পরোক্ষ। সেই সঙ্গে ব্যাপারটি কিছুটা ব্যক্তিগত পছন্দের। বহু রঙে নয়; এক রঙে আত্মবিশ্বাসী বোধ করেন অনেকে। এ ছাড়া রঙেরও আছে বিশেষ আবহ। যেমন কর্তৃত্বের অনুভূতি দেয় কালো রং। নেভি বা গাঢ় নীল বোঝায় স্থিরতা। ধূসর বা বেইজ প্রকাশ ঘটায় হালকা, আরামদায়ক ও পরিমিত রুচির। আবার একই রঙের ভিন্ন শেড ব্যবহার করা যায়। এতে আঁটসাঁট ফ্যাশনও হয়ে ওঠে পূর্ণ। এটিই মনোক্রোমের আসল জাদু।
মুগ্ধতার মোহ
পুরুষদের সমসাময়িক স্টাইলে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা হলো মিনিমালিজম, স্ট্রিটওয়্যার এবং মডার্ন টেইলারিং। এই তিনের সমন্বয়ের তৈরি হয় মনোক্রোমের ভাষা। মিনিমালিজমের মূলকথা, যতটা সম্ভব কম রঙের ব্যবহার। যত কম রং, তত কম বিভ্রান্তি। স্ট্রিটওয়্যারে এক রং লুককে শার্প করে। আর আধুনিক টেইলারিংয়ে মনোক্রোম কাট, ফিট ও কাপড়কে সামনে নিয়ে আসে। এক রঙের কারণে সেখানে পুরো মনোযোগ কাপড় আর কাটের ওপর থাকে। ফলে পোশাকের নকশাই হয়ে ওঠে মূল আকর্ষণ। তা ছাড়া শুধু ফরমাল ওয়্যারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, এমনটা নয় মনোক্রোম। মানিয়ে যায় করপোরেট থেকে ক্যাজুয়ালে। মুগ্ধতা ছড়ায়। সেটি হোক ইউনিফর্ম অথবা পাওয়ার স্যুট। এক রঙের ব্যবহার, ক্যাজুয়াল স্ট্রিটওয়্যারে অল-ব্ল্যাক হুডি-ডেনিম বা অল-আর্থ-টোন লুক—সবেতেই মোনোক্রোম স্টাইলিশ দেখায়। আর এই বহুমুখিতাই একে রাখে সময় থেকে এগিয়ে।
স্টাইলিং স্টেটমেন্ট
এক রং, কিন্তু একঘেয়ে নয়। এটাই মনোক্রোমের আবহ। এ ধারার স্টাইলে বারবার ফিরে আসে কয়েকটি রং। যেমন কালো, সাদা, ধূসর, বেইজ, নেভি এবং বিভিন্ন আর্দি টোন। গুরুত্ব পায় স্টাইলিংও। মনোক্রোমে এক রঙের পোশাকে থাকতে পারে লেয়ারিং। একই রঙের শার্ট, জ্যাকেট ও ট্রাউজার ব্যবহার করা যায়। স্টাইলিশ দেখায় এবং ট্রেন্ডিও। মনোযোগ চাই টেক্সচারেও। উল, কটন, ডেনিম, নিট—একই রঙে ভিন্ন ভিন্ন কাপড় ব্যবহার করা যেতে পারে। খেয়াল রাখা চাই ফিটিংয়েও। পরিষ্কার নকশাকাট পূর্ণতা আনবে লুকে। সঙ্গে থাকতে পারে মানানসই অনুষঙ্গ—জুতা, বেল্ট, ঘড়ি, জুয়েলারিতে একই রঙের ভিন্ন ভিন্ন শেড।
উপসংহারে উপস্থিতি
ফাস্ট ফ্যাশনের ভিড়ে আবারও মিনিমালেই ফিরছে মানুষ। লেস ইজ মোর—এই ধারণার সঙ্গে মনোক্রোম খুব ভালোভাবে মানিয়ে যায়। টেকসই ফ্যাশন, ক্যাপসুল ওয়্যারড্রোব এবং মিনিমাল লাইফস্টাইলের কারণে মনোক্রোম ভবিষ্যতেও গুরুত্বপূর্ণ থাকবে বলে ধারণা ফ্যাশনিস্তাদের। শেডভিত্তিক মনোক্রোম, জেন্ডার-নিউট্রাল রং এবং প্রযুক্তিনির্ভর কাপড়ের ব্যবহার জুড়বে এতে। কারণ, ফ্যাশনের চেয়ে বেশি মনস্তত্ত্বের কাজ মনোক্রোমে। অর্থাৎ, এটি আসলে একধরনের মাইন্ড সেট। মিনিমাল কৌশলে নিজেকে প্রকাশের ইচ্ছা।
খুব কম সময়ে পরিপাটি হতে চাওয়া পুরুষদের জন্য এক রঙের ভাষা সহজ। অবশ্য এ ধারায় পিছিয়ে নেই নারীরাও। কারণ, এই ফ্যাশন মানিয়ে যায় দ্রুত বয়ে চলা সময়ের সঙ্গে।

মডেল: আরহাম
মেকওভার: পারসোনা
ওয়্যারড্রোব: ব্লুচিজ
ছবি: জিয়া উদ্দীন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top