মনোজাল I সন্ধির সন্ধানে
বসন্ত আর রোজার এই সময়ে আয়োজনের শেষ নেই। আবার, যখন যে ঢঙে সাজার চল, সে অনুযায়ী যথার্থ হওয়া চাই সাজপোশাক। তা ছাড়া টেকসই তত্ত্বে বিশ্বাসীরা হাত ভর্তি শপিং ব্যাগের পক্ষে নন; বরং তাদের আস্থা এক পোশাকের বহু স্টাইলে। সেখান থেকে মনে তৈরি হতে পারে টানাপোড়েন
মিলেনিয়াল আর জেনারেশন জেড মিক্স অ্যান্ড ম্যাচে দারুণ কৌশলী। এর সঙ্গে ওর বন্ধন তৈরি করে নতুন কিছু। পুরো আউটফিট কিনে নেওয়ার ইচ্ছা তাদের কম। একটি কিনে হাজার রকম কারসাজিতে সম্পন্ন করতে চাই আউটফিট প্ল্যানিং; যা আছে তা-ই দিয়ে সই! কিসের সঙ্গে কী মেলাবেন, চলতে থাকে কল্পনা। আর সেখানেই ভর করে সিদ্ধান্তহীনতা। পোশাকের রঙের সঙ্গে ব্যাগ বা জুতার রং মেলাতে গিয়ে হিমশিম অবস্থা। একের পর এক জামা পাল্টালেও সায় দেয় না আয়না। ফলে আসে হতাশা ও ক্লান্তি। বাইরে যাওয়ার জন্য তৈরি হওয়ার কথা ভেবেই দিশেহারা অনেকে। এই অবস্থাকে বলে আউটফিট কো-অর্ডিনেশন অ্যাংজাইটি।
উদ্বেগের উৎপত্তি
লাতিন ভাষার শব্দ অ্যাংজাইটাস। সেখান থেকে অ্যাংজাইটি প্রবেশ করেছে ইংরেজিতে। সরল বাংলায়, উদ্বেগ বা উৎকণ্ঠা। গুরুতর কোনো মানসিক রোগ নয়; বরং মনের এক পরিস্থিতি। তীব্র অস্থিরতা ও অস্বস্তির অনুভূতি। উৎকণ্ঠা সবারই হতে পারে। কারণে-অকারণে। যেকোনো সময়। কারণ, মনের ওপর সব সময় নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব। পোশাক বাছাইয়ের সময় প্রায়ই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন অনেকে; বিশেষ করে ফ্যাশনিস্তারা। নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরখ করেন যারা, পোশাকের সঙ্গে কানের দুলের রং না মিললেই অস্থির হয়ে পড়েন। সাজতে গিয়ে হাঁপিয়ে ওঠেন। এ যেন প্রতিদিনকার দুশ্চিন্তা।
মনস্তত্ত্বের এই দায় চাপানো হয় ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির ওপর। বিস্তৃত এই জগতে প্রতিদিনই আসছে নিত্যনতুন ধারা। তার মধ্যে খুঁজে নিতে হয় ব্যক্তিগত স্টাইল। রকমারি হাল ফ্যাশনে গা ভাসাতে না পারলে অনেকের উদাস হতে পারে মন। দেখা দিতে পারে উদ্বেগ। তবে পুরো দায়টা ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির নয়; বরং সামাজিকভাবে বিব্রত হওয়ার ভয় থেকে তৈরি হয় এমন উৎকণ্ঠা—দাবি করা হয়েছে ২০০২ সালে যুক্তরাজ্যভিত্তিক টেইলার অ্যান্ড ফ্র্যান্সিস জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে। ব্রিটিশ নৃতত্ত্ববিদ অ্যালিসন ক্লার্ক ও ড্যানিয়েল মিলারের লেখা পত্রটির শিরোনাম ‘ফ্যাশন অ্যান্ড অ্যাংজাইটি’। পরবর্তীকালে ‘ফ্যাশন অ্যান্ড থিওরি’ বইয়ে যুক্ত করা হয়। এতে বলা হয়, ব্যক্তিগত রুচি নিয়ে অনিশ্চয়তার অভাবে উৎকণ্ঠা জাগতে পারে। আলমারি ভর্তি পোশাক এবং ফ্যাশন জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও ‘কী পরব’; তা ভেবে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ সামাজিক চাপ এবং অন্যদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা। সমস্যাটি আসলে অ্যাসথেটিক নয়; প্র্যাকটিক্যাল। ‘আমাকে কেমন দেখাবে’, তা নয়; অন্যরা কী ভাববে—সেই দুশ্চিন্তা। আয়োজনের সঙ্গে পোশাক মিলিয়ে পরার তাড়না। সঙ্গে নিজেকে সবচেয়ে সুন্দর দেখানোর চেষ্টা থেকেও তৈরি হতে পারে উদ্বেগ। তখন অন্যের বিয়েতে নিজে বউ সেজে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। তার ওপর আছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাপ। নিত্যনতুন ট্রেন্ডের বশবর্তী হয়ে সাজতে ইচ্ছা করে সেভাবে। আজ লম্বা এ-লাইন জামা, দুদিন পরেই ভালো লাগে ফারসি সালোয়ার-কামিজ। এ ক্ষেত্রে কম নন পুরুষেরাও।
ট্রেন্ডে দেখে নতুন রং-ঢঙে ফ্যাশন করার ইচ্ছা তো সবারই হয়। তা না করতে পারলেই ভর করে অ্যাংজাইটি। একটি নতুন পোশাক একবারের পর আর পরতে ইচ্ছা করে না। ছবি তুলে ফেললে তো কথাই নেই; সেই জামা পড়ে থাকে আলমারির অতলে। এতে অভাব তৈরি হয় দ্রুত। মনে হয়, কিছু নেই পরার মতো। উদ্বিগ্ন হয়ে একের পর এক পোশাক কেনেন অনেকে। চাপ বাড়ে পকেটে। আলমারি ভর্তি জামা থেকে কোনো একটি বেছে নেওয়া কঠিন ঠেকে। ‘কোনটা পরব’, তার সঙ্গে মিলিয়ে চাই জুতা, গয়না আর ব্যাগ। একটি নির্দিষ্ট লুকের কথা ভাবতে হাঁপিয়ে ওঠে মন।
সাজগোজের এই আয়োজনে কমতি রাখা দায়। হওয়া চাই পারফেকশনিস্ট। এই ভাবনা থেকেও তৈরি হতে পারে উদ্বেগ। যদি ভুল হয়? যদি ভালো না দেখায়? অস্থির করে ভয়।
ভয় জয়ে
শুধু নিজের স্বাস্থ্য নিয়ে অসন্তুষ্টির কারণে পছন্দের পোশাক পরেন না অনেকে। ব্যাগি বা ঢিলেঢালা পোশাকে চলে নিজেকে ঢাকার চেষ্টা। যেন স্টাইল করতে নয়; দিনটা কোনো রকম কাটিয়ে দিতে পোশাক পরা। বেসিকেই আটকে যাওয়া। মার্কিন পপতারকা বিলি আইলিশের কথা ধরা যাক। অতিরিক্ত ব্যাগি পোশাক পরার কারণে ক্যারিয়ারের শুরু থেকে ছিলেন সমালোচিত। প্রশ্নবাণে জর্জরিত হয়ে একদিন নিজেই জানান এমন স্টাইলের পেছনের গল্পটা। ২০২৩ সালে ফ্যাশন ম্যাগাজিন ভোগকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিলি বলেন, ‘কৈশোরে নিজেকে ঘৃণা করতাম। নিজের শরীরের ওপর রাগ হতো। বহু বছর মনে হয়েছে, যেন আমার শরীরই আমাকে প্রতারিত করছে।’ ২০১৯ সালে ফ্যাশন ব্র্যান্ড কেলভিন ক্লেইনকে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি ঢিলেঢালা ব্যাগি পোশাক পরি। কারণ, ভেতরে কী আছে, তা কেউ দেখে না। তাই কেউ মতামত দেওয়ারও সুযোগ পায় না।’ ফ্যাশন ঘিরে এই উৎকণ্ঠার খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন বিলি। সবাইকে চমকে দিয়ে পিচি পিংক রঙের আঁটসাঁট গাউনে হাজির হয়েছিলেন ২০২১ সালের মেট গালার আসরে। নিজের জন্মদিন উপলক্ষে স্টাইল বদলানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এই তারকা।
যত্ন করে তুলে রাখা প্রিয় সাদা জামা ত্বকের সঙ্গে মানাবে তো? কানের দুলটা বেশি বড় কি? ডেনিম প্যান্ট পরলে লোকে কী বলবে? এমন হাজারো ভাবনা জায়গা করে নেয় আলমারি আর তার সামনে দরজা খুলে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির মাঝে। যেন প্রতিদিনকার এক অশান্তি। মুক্তি পাওয়া জরুরি। আছে কিছু সহজ উপায়। সেগুলো জেনে থাকা শ্রেয়।
ম্যারি কন্ডো মেথড
কাপড় রাখার জন্য এমন একটি আলমারি বা জায়গা তৈরি করা চাই, যেখানে শুধু সেই পোশাকগুলো থাকবে, যেগুলো আপনি সত্যি ভালোবাসেন। পরতেও স্বাচ্ছন্দ্য পান। যেসব পোশাক ঠিকমতো ফিট হয় না, অস্বস্তিকর বা খারাপ স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়, সেগুলো অন্য কোথাও সরিয়ে আলাদা করে রাখতে পারেন। এ কৌশলকে বলে ম্যারি কন্ডো। অগোছালো আলমারি অনেক সময় মনও এলোমেলো করে তোলে। তাই গুছিয়ে রাখা প্রয়োজন।
ক্যাপসুল ওয়্যারড্রোব
অল্পসংখ্যক কিন্তু মানসম্মত পোশাক রাখতে পারেন সংগ্রহে। ক্যাপসুল ওয়্যারড্রোব মানেই ভার্সাটাইল পোশাক সংগ্রহ। যেমন ১৫টি পোশাক দিয়ে তৈরি করা যাবে ৩০টি ভিন্ন ভিন্ন লুক। এতে পোশাক নির্বাচন সহজ হয়। মানসিক চাপ অনেকটা কমে যায়।
ডিক্লাটার
যেগুলো পরেন না, পরতে আগ্রহীও নন, সেগুলো থেকে মুক্তিই সই। জমিয়ে রাখা পুরোনো জামা ও অনুষঙ্গকে বিদায় জানানো শ্রেয়। অপ্রয়োজনীয় মনে হলে জমিয়ে না রেখে ডিক্লাটার করতে পারেন। এতে নতুন স্টাইলের জন্যও জায়গা তৈরি হবে।
পূর্বপরিকল্পনা
রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগেই ঠিক করে রাখতে পারেন পরদিন সকালে পরার পোশাকটি। এটি অভ্যাসে পরিণত হলে আরও ভালো। এতে সকালে উঠে মানসিক অশান্তি অনেকটা কমে যাবে। আসন্ন কোনো আয়োজনে পরার পোশাক নিয়েও আগে থেকে ভাবতে পারেন। কেমন লুক চান, সেই ছবি মনে মনে তৈরি করে নিয়ে আগে থেকে চলতে পারে নিঃশব্দ প্রস্তুতি।
রুচির খোঁজ
নিজের পছন্দ ও স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে স্পষ্ট ধারণাই এই উদ্বেগের সরল সমাধান। কোন ধরনের পোশাকে নিজেকে সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে, কোন রঙে বেশি মানায়, কোন নকশায় প্রতিফলিত হয় ব্যক্তিত্ব—এগুলো জানা থাকলে স্টাইল করা সহজ হয়। খোঁজ করতে পারেন বিভিন্ন ফ্যাশন ভ্লগ, ম্যাগাজিন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। নিতে পারেন অনুপ্রেরণা। বিভিন্ন স্টাইল ও ট্রেন্ড দেখে সেগুলো নিজের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন। চলতি ফ্যাশনে কী আছে, তা দেখলে নিজের রুচি নিয়েও হয়তো আসবে নতুন ভাবনা। সেভাবেই বদলে নেওয়া যেতে পারে ব্যক্তিগত স্টাইল।
রিসাইকেল
যে জামা বা প্যান্ট ভালো লাগে না কিংবা পরা হচ্ছে না, সেটি দিয়ে অন্য কিছু তৈরি করতে পারেন। সাধারণ জিনসের প্যান্টকে সুতার কাজের মাধ্যমে স্টাইলিশ করে তুলতে পারেন। কাপড়ে কাপড় মিলিয়ে তৈরি করতে পারেন পছন্দের কিছু। অর্থাৎ সৃজনশীলতা কাজে লাগানো চাই। এভাবে আপসাইক্লিং করলে শুধু পুরোনো পোশাকে নতুন প্রাণই পায় না; বরং নিজের মধ্যেও জাগায় সন্তুষ্টি ও অর্জনের অনুভূতি।
যা ভালো লাগে, তা-ই যেন হয়ে ওঠে সাজপোশাকের অংশ। তাতে সংশয় দূর হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। বাইরে যাওয়ার আগে ক্লান্তি ভর করে না। অর্থাৎ, যেমন খুশি তেমন সাজো! আর তাতেই ত্বরান্বিত হতে পারে আউটফিট কো-অর্ডিনেশন অ্যাংজাইটির সমাপ্তি।
আবৃতি আহমেদ
ছবি: ইন্টারনেট
