এডিটর’স কলাম I শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান
হাতের আঙুলগুলো যেভাবে পাশাপাশি থেকে সক্রিয়তার সক্ষমতা ধারণ করে, অন্তর্গত মানুষগুলোর পারস্পরিক শান্তিপূর্ণ ও সক্রিয় সহাবস্থান একটি সমাজের জন্য তেমনি গুরুত্ববহ
হাতের পাঁচ আঙুল সমান হয় না—খুব চেনা প্রবাদ, পরিচিত বাস্তবতা। আক্ষরিক অর্থে যেমন, রূপকার্থে তারও অধিক তাৎপর্যপূর্ণ। একেক আঙুলের একেক আকার প্রাকৃতিকভাবেই ভিন্ন। তা আমরা হয়তো কখনো গভীর মনোযোগে খেয়াল করি না। যদি আঙুলগুলো ঠিকঠাক কাজ করে, তথা মুঠো ঠিকমতো ধরা যায়—এ নিয়ে বাড়তি ভাবনায় হই না মগ্ন। কিন্তু কোনো একটি আঙুলে সামান্য সমস্যা ধরা দিলেই ঘটে বিপত্তি। তা সারিয়ে তুলতে যথাসম্ভব শরণাপন্ন হই চিকিৎসকের। আমাদের সামাজিক জীবনও একইভাবে কার্যরত। নানা ধরনের মানুষে গড়া। একেকজন বিবিধ নিরিখেই আলাদা। সবাই মিলে একসঙ্গে সামাজিক জীবন ভালোভাবে কাটাতে জানলে তা টের পাওয়া যায় না খুব একটা। কিন্তু কোনো এক বা একাধিক জন কোনো গোলমাল ঘটালে পুরো সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলায় নেমে আসে বিপর্যয়। তাই হাতের আঙুলগুলো যেভাবে পাশাপাশি থেকে সক্রিয়তার সক্ষমতা ধারণ করে, অন্তর্গত মানুষগুলোর পারস্পরিক শান্তিপূর্ণ ও সক্রিয় সহাবস্থান একটি সমাজের জন্য তেমনি গুরুত্ববহ।
দুই
‘যেকোনো মূল্যে মুনাফা কামানো হলো বর্ণচ্ছটার একটি চরম সীমা। অপর চরম সীমাটি হলো সমাজের ভালোর জন্য, আরও বিশদে বললে, দানশীলতার জন্য নিঃস্বার্থ আত্মনিবেদন করা। এর মাঝামাঝি কোনো এক জায়গায় অবস্থান শান্তির; তা পেতে সহাবস্থান ভীষণ দরকার’—বলেছেন ‘ভারতের বায়ুমানব’খ্যাত, জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির ‘চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থ’ পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা তুলসী তাঁতী। মানবসমাজে সহাবস্থানের উপস্থিতি বেশ প্রাচীন। পুঁথিগতভাবে এই ধারণার অর্থ হলো, ‘অভিন্ন স্থান ও সময়ে বসবাসরত নানা মানুষের ভালোবাসা ও সংগতির কিংবা একসঙ্গে অবস্থানের মধ্যে জীবন কাটানো।’ ধর্ম, বর্ণ বা ভাষার ফারাক সত্ত্বেও একটি সমাজে শান্তি ও সংগতিপূর্ণভাবে নানা ধরনের মানুষের জীবনযাপনও সহাবস্থান। অন্যদিকে, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান মানে এমন এক পরিবেশ, যেখানে সমাজের বিভিন্ন অংশের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া কাজ করে এবং তা মর্যাদা পায়। ধারণাটির বিশদ ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়, খাদ্য, পানীয় তথা জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানগুলোর নিমিত্তে একদল মানুষের একটি স্থানে পরস্পরের সঙ্গে ভাগাভাগি করার বোধ নিয়ে জড়ো হওয়া। তাই এমন সহাবস্থানে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত থাকা আবশ্যক।
তিন
শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের গুরুত্ব অসীম। এর ফলে সমাজে বিদ্যমান কুসংস্কার ও সেকেলে ধ্যানধারণা কমিয়ে আনা এবং বৈচিত্র্যকে প্রশংসা ও উদ্যাপন করতে ব্যক্তিমানুষদের প্রেরণা জোগানো সম্ভব হয়। একটি সামগ্রিক সত্তার মধ্যে ঋদ্ধ সাংস্কৃতিক বিনিময় ঘটানো এবং অনুপম আত্মপরিচয়গুলো সংরক্ষিত রাখার পথ করে দেয় এটি। এই ধারণায় সমাজের মানুষের মধ্যে সংলাপের সুযোগ ঘটে; ফলে বিদ্যমান মতবিরোধ সহজে চিহ্নিতকরণ এবং তা সমাধানের উপায় পাওয়া যায়। অর্থনৈতিক উন্নতিতেও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান রাখে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। কেননা, যেকোনো শান্তিপূর্ণ সমাজই অর্থ লগ্নি করতে উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ীদের এবং ভ্রমণে পর্যটকদের আকৃষ্ট করে; ফলে সেখানে একটি সুস্থির কর্মী বাহিনী তৈরি হয়। অন্যদিকে, বৃহত্তর মাত্রায় এর রয়েছে বৈশ্বিক প্রভাব। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এটি শান্তি ও সহযোগিতা বজায় রাখতে এবং এর ফলে বৈশ্বিক সমস্যা তথা জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য ও বৈষম্যের চ্যালেঞ্জগুলো রুখতে ভূমিকা রাখে। তাই আন্তর্জাতিক সংস্থা দ্য ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেস ফর দ্য প্রোকেটশন অব দ্য রাইটস অ্যান্ড ফ্রিডমস অব সিটিজেনস (শিল্ড) নিজ লক্ষ্যগুলোর একটি ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের গুরুত্বের ওপর জোরারোপ করে থাকে।
চার
জাতিসংঘের মতে, শান্তি শুধুই মনুষ্যত্বের একটি মহৎ দূরদর্শিতা নয়; বরং তা সক্রিয় করার জরুরি আহ্বান। সমাজে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান গড়ে তুলতে তাই কিছু দিকনির্দেশনা জাহির করেছে সংস্থাটি। তাতে প্রথমে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে শান্তির পক্ষে আওয়াজ তোলার ব্যাপারে। আরও গুরুত্ব পেয়েছে এ বিষয়ে নিজেকে শিক্ষিত করে তোলা, যেকোনো সহিংসতাকে ‘না’ বলা, বোঝাপড়া ও সংহতির চর্চা চালানো, ভর্ৎসনা ও হয়রানি রুখে দেওয়া, বৈষম্য ও ভেদাভেদের প্রতিবাদ জানানো, অন্তর্ভুক্তি ও বৈচিত্র্যকে ধারণ করা ইত্যাদি। নিজের ভেতর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বোধ লালন করার জন্য কয়েকটি মানসিক অনুশীলনের ওপর জোর দিয়ে থাকেন মনোবিজ্ঞানীরা। যেমন নিজের মন প্রশমিত রাখা, জীবনকে সহজ করে তোলা, আন্তব্যক্তিক সংঘাতগুলো ইতিবাচকে রূপান্তর করা, শুধু নিজেকে নিয়েই না ভেবে অপরদের ঘিরেও ভাবা প্রভৃতি।
পাঁচ
মানুষ সামাজিক জীব—ভীষণ পুরোনো, চরম ক্লিশে, অথচ পরম সত্য কথা। তাই একা একা শান্তিতে থাকা আক্ষরিক অর্থে কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়; বরং শান্তিপূর্ণ জীবন নিশ্চিতে অন্যদের নিয়েও ভাবা জরুরি। এই বোধ থেকে জাতিসংঘের উদ্যোগে প্রতিবছরের ২৮ জানুয়ারি পালিত হয় আন্তর্জাতিক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান দিবস (ইন্টারন্যাশনাল ডে অব পিসফুল কো-অ্যাক্সিসট্যান্স)। ব্যক্তিজীবন তথা সমাজ কিংবা পৃথিবীতে শান্তি বজায় রাখতে প্রত্যেক মানুষের নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখা জরুরি।
সবার মঙ্গল হোক।
