skip to Main Content

পাতে পরিমিতি I স্লিপ সাপোর্টিভ

ঘুমের সমস্যা নিয়মিত হলে জীবনে নেমে আসে দুর্বিষহ যাতনা। ঘুম সহায়ক খাদ্য বাছাই ও জীবনধারা বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন পুষ্টিবিদ নিশাত শারমিন নিশি

সারা দিন বিবিধ মানসিক চাপ, ব্যস্ততা আর অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম—এমনটাই আজকাল অনেকের প্রাত্যহিক জীবনধারা। ফলে দিন শেষে কাটতে চায় না ক্লান্তি। সারা দিনের অবসাদের পরও রাতভর নেটওয়ার্কিং, সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় দেওয়া, স্ক্রিনের সামনে রাত পার করা খুব সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। তাই অনেকের জীবনে ঘুম যেন একধরনের সোনার হরিণ! অথচ মানসম্মত ও পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে তৈরি হতে পারে ফ্রি র‌্যাডিক্যাল, যা স্বাস্থ্যের পক্ষে হানিকর। সত্যি বলতে, সুস্থতার জন্য ভালো ঘুম অপরিহার্য।
পর্যাপ্ত ঘুম হলে মস্তিষ্ক অপ্রয়োজনীয় তথ্য ছেঁকে ফেলে, হরমোনগুলো ব্যালান্স করতে সক্ষম হয়। রোগ প্রতিরোধক্ষমতা হয় শক্তিশালী। ফলে ঘুম থেকে উঠে যখন আরেকটি দিনের সূচনা ঘটে, তখন নতুন করে পাওয়া যায় সতেজ শরীর ও মস্তিষ্ক। আসলে ঘুমকে শুধু বিশ্রাম না বলে শরীরের প্রাকৃতিক থেরাপি অভিহিত করাই শ্রেয়, যা দেহ রাখে চাঙা ও কর্মক্ষম।
জীবনধারা পরিমার্জন
অনেকেরই সহজে ঘুম আসতে চায় না। সারা রাত বিছানায় এপাশ-ওপাশ করেও মেলে না সুফল। প্রকৃত অর্থে আমরা যা খাই, তা শরীরে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। তাই ঘুমের জন্য সহায়ক খাদ্যতালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রেও কিছু বিষয় যোগ-বিয়োগ করা প্রয়োজন।
 ভারী খাবার, ভাজা বা ঝাল কার্বোহাইড্রেটের বদলে লাইট ডিনার ঘুমের জন্য বেশি উপযোগী। এই অভ্যাস স্ট্রেস ও অস্থিরতা কমাতেও ভূমিকা রাখে।
 যারা মাছ কম খান, তাদের খাদ্যতালিকায় ওমেগা থ্রি একটু কমই থাকে। সে ক্ষেত্রে নিয়মিত চিয়া সিড বা ফ্ল্যাক্স সিড খেলে উপকার পাবেন।
 এক কাপ গরম দুধ রেগুলার খাদ্যতালিকায় রাখা জরুরি; তবে ঘুমের আগে গ্রহণ করলে এটি চমৎকার কাজ করে। তাই রাতে শোয়ার আগে খাদ্যতালিকায় যুক্ত করতে পারেন এক কাপ লো ফ্যাট মিল্ক।
 যাদের অ্যাসিডিটি বা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা থাকে, তারা নিয়মিত প্রোবায়োটিক খেলে ঘুমের ওপরও ভালো প্রভাব পড়বে। সে ক্ষেত্রে ইয়োগার্ট সবচেয়ে ভালো সোর্স।
 রাতে একটু আর্লি ডিনার করলে অনেকের ঘুমানোর আগে আবার স্ন্যাকস নিতে ইচ্ছা করে। সে ক্ষেত্রে ভারী খাবার না খেয়ে নাটস, বিশেষ করে আমন্ড কিংবা কলা খেতে পারেন।
উপকারী উপাদান
ঘুমের সঙ্গে হরমোনের রয়েছে সরাসরি সংযোগ। হরমোনাল ইমব্যালেন্স থাকলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। পর্যাপ্ত ঘুম টেস্টোস্টেরন, গ্রোথ হরমোন, কর্টিসল ও ইনসুলিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। এ ছাড়া আমাদের মেটাবলিজম, মুড, এনার্জি এমনকি ওজনসহ সামগ্রিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে; তাই ভালো ঘুম সুস্থ হরমোনের জন্য অপরিহার্য। আর এই ব্যালেন্স ধরে রাখতে খাদ্যতালিকায় রাখা চাই নির্দিষ্ট কিছু পুষ্টি উপাদান।
মেলাটোনিন
ঘুমের মূল নিয়ন্ত্রক হরমোন হলো মেলাটোনিন। দিনের শেষে সূর্য ডুবে যখন অন্ধকার নামে, তখন থেকেই শরীর স্বাভাবিকভাবে মেলাটোনিন তৈরি করতে শুরু করে। মস্তিষ্কের পিনিয়াল গ্রন্থি এটি নিঃসরণ করে, যা আমাদের ঘুমিয়ে পড়তে সাহায্য করে। কিছু খাবার গ্রহণে সরাসরি মেলাটোনিন পাওয়া যায়। যাদের সাধারণত ঘুম আসতে খুব দেরি হয় এবং ঘুমের মানও তেমন উন্নত নয়, তারা খাদ্যতালিকায় যুক্ত করতে পারেন মেলাটোনিন সমৃদ্ধ খাবার। কিছু ফলে মেলে এই হরমোন।
 কলা: নিউট্রিয়েন্টে ভরপুর এই ফলকে বলা হয় সুপার ফুড। প্রাকৃতিক মেলাটোনিনের পাশাপাশি এতে রয়েছে প্রচুর ম্যাগনেশিয়াম। পেশি রিলাক্স করতে তাই কলার জুড়ি নেই।
 টার্ট চেরি: ঘুম উন্নত করার আর সাউন্ডস স্লিপের জন্য নিয়মিত টার্ট চেরি জুস পান করতে পারেন। এতে ঘুমের ব্যাপ্তি দীর্ঘ হয়। অনেকের রাতে কয়েকবার ঘুম ভেঙে যায়; তাতে দেহ-মনে তৈরি হয় অস্থিরতা। তা থেকে রেহাই পেতে এই চেরি হতে পারে দারুণ চয়েস।
 এ ছাড়া আনারস, কমলা, আঙুর—এ ধরনের ফলগুলোও মেলাটোনিন তৈরি করে শরীরের ঘুমের সিগন্যাল বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
ট্রিপটোফ্যান
প্রোটিন গ্রহণের পর তা ভেঙে তৈরি হয় অ্যামিনো অ্যাসিড। এ ধরনের এসেনশিয়াল অ্যাসিডগুলো শরীরে নিজে নিজে তৈরি হতে পারে না; তাই খাবার থেকে গ্রহণ করতে হয়। দেহে প্রোটিন, সেরোটোনিন ও নায়াসিন তৈরিতে ভূমিকা রাখে এই ট্রিপটোফ্যান; যা ভালো রাখে আমাদের মেজাজ। আর ভালো ঘুম ও শক্তি বিপাকের জন্যও ট্রিপটোফ্যান গুরুত্বপূর্ণ। এটি পাওয়া যায় দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, ডিম, স্যামন, টুনা, সার্ডিন, বিভিন্ন ধরনের বাদাম ও সিডস, তিল, ডাল, ছোলা ইতাদি থেকে।
প্রোবায়োটিক
ভালোভাবে ঘুমাতে চাইলে ভালো রাখা চাই হজম ক্ষমতা। সে ক্ষেত্রে গাট ও ব্রেইন কানেকশন শক্তিশালী করতে সহায়ক প্রোবায়োটিক রাখা যেতে পারে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায়। দই হচ্ছে প্রোবায়োটিকের বেস্ট সোর্স; তবে কেফির, কিমচি, ফারমেন্টেড ফুড ইত্যাদি থেকেও এটি পাওয়া যায়।
অনুমানে মানা
অনুমান কিংবা অপ্রতুল জ্ঞানে ভর করে, অথবা ডায়েট মাথায় রেখে অনেকে বিভিন্ন রকমের প্রয়োজনীয় উপাদান খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেন; বিশেষ করে রাতে না খাওয়া বা সকালের খাবার স্কিপ করা যাদের কাছে তেমন একটা গুরুত্ব পায় না, তাদের ক্ষেত্রে রাতভর ঘুমের অসুবিধা বেশি হতে দেখা যায়। আমাদের দেহে পর্যাপ্ত নিউট্রিশন না থাকলে শরীর হয়ে পড়ে দুর্বল। পরিমিত ক্যালরির অভাবেও দেখা দেয় ক্লান্তি। তাই ডায়েট মেইনটেইনের চাপে রাতে যারা মিল স্কিপ করেন, অবশ্যই মনে রাখা চাই, রাতের খাবার পুরোপুরি বন্ধ না করে, নিখুঁত ঘুমে সহায়ক ধরনের খাবার রাখতে পারেন ডায়েটে।
 ওটস, কলা, আখরোট একটু কুসুম গরম দুধ এবং সামান্য এলাচির মিশ্রণে খাওয়া যেতে পারে রাতের মিল হিসেবে। এটি লাইট ডিনার হলেও এতে রয়েছে ক্যালরি ও নিউট্রিয়েন্টের ব্যালেন্স। এর প্রভাবে চোখের পাতায় সহজে নেমে আসতে পারে ঘুম!
 ইয়োগার্ট, চিয়া সিড আর এক মুঠো আমন্ড নেওয়া যেতে পারে লাইট স্ন্যাকস হিসেবে আফটার ডিনারে। অনেক সময় অনেকে বিকেলে ভারী স্ন্যাকস গ্রহণ করলে ডিনার স্কিপ করেন; সে ক্ষেত্রে আবার রাত নামতেই ক্ষুধার কারণে খেতে শুরু করেন ডেজার্ট, পায়েস, কুকিস ইত্যাদি। তাদের ক্ষেত্রে এ ধরনের স্ন্যাকস বেস্ট।
 রাতে একটু কাজ থাকলেই যাদের চা-কফি ছাড়া চলে না, তাদের ক্ষেত্রে কাজ শেষ হলে অনেক সময় পালিয়ে যায় ঘুম! সে ক্ষেত্রে রাতের লিস্ট থেকে এ ধরনের ক্যাফেইন রিপ্লেস করে রাখা যেতে পারে ক্যামোমাইল টি কিংবা দু-একটি খেজুর। এতে শরীর যেমন কাজের জন্য চাঙা থাকে; তেমনই কাজ শেষে ঘুমেও সহায়ক।
হালকা, পুষ্টিকর ও ঘুমবান্ধব খাবার খাদ্যতালিকায় যুক্ত করার পাশাপাশি কফি, ব্ল্যাক টি, গ্রিন টি, চিনিসমৃদ্ধ পানীয়, ভাজাপোড়া ইত্যাদি বাদ দেওয়া আবশ্যক; বিশেষ করে বিকেলে বা সন্ধ্যার পর এসব খাবার গ্রহণ করলে ঘুম ও হরমোনের ব্যালেন্স নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে, কর্টিসল বাড়ে এবং রাতের বিশ্রাম ব্যাহত হয়।
মোটকথা, ঘুম হলো স্বাস্থ্য সুরক্ষার এক নীরব শক্তি। মনে রাখা চাই, প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম। তাই সুস্বাস্থ্য রক্ষায় প্রতিদিন চাই পরিমিত ক্যালরি গ্রহণ এবং পর্যাপ্ত ঘুম।

লেখক: প্রধান পুষ্টিবিদ ও বিভাগীয় প্রধান, পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা
ছবি: ইন্টারনেট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top