skip to Main Content

প্রাগৈতিহাসিক I ভাইকিং ভোজ

সময়কাল ৮০০ থেকে ১১০০ খ্রিস্টাব্দ। নরডিক অঞ্চলে বসবাস করা ভাইকিং ছিল এমনই এক সামুদ্রিক জাতি; যুদ্ধে পারদর্শিতার পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় সবকিছুতে যাদের ছিল স্বকীয় দক্ষতা। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার কঠোর শীত, স্বল্প আবাদযোগ্য জমি এবং দীর্ঘ অন্ধকারময় শীতকাল তাদের খাদ্যাভ্যাস নির্ধারণে রেখেছিল মূল ভূমিকা

স্ক্যান্ডিনেভিয়ার (উত্তর ইউরোপীয় তিন দেশ নরওয়ে, সুইডেন ও ডেনমার্ক) কুয়াশাচ্ছন্ন জলরাশি, বিশাল বরফঢাকা উপকূল আর ধূসর আকাশ—এই পরিবেশে জন্ম নিয়েছিল এক যোদ্ধা জাতি, যাদের নাম শুনলে আজও অনেকের বুকের ভেতর কেমন একটা গর্জন ওঠে; নাম ভাইকিং। তাদের পরিচয় শুধু লুণ্ঠনকারী সমুদ্রযোদ্ধা হিসেবে নয়; বরং জটিল সামাজিক কাঠামো, ব্যাপক বাণিজ্যিক যোগাযোগ আর অনন্য খাদ্যসংস্কৃতির মধ্যেও খুঁজে পাওয়া যায়। যে যুগে ইউরোপের দক্ষিণাংশে মসলা, রুটি এবং আঙুরের বিশেষ পানীয় সমৃদ্ধ টেবিল সাজাত, সেই সময়ে উত্তর সমুদ্রের মানুষের খাদ্যাভ্যাস গড়ে উঠেছিল ভিন্ন ভূপ্রকৃতি ও আবহাওয়ার দাবিতে।
স্ক্যান্ডিনেভিয়ার হিমশীতল উপকূলে যখন উত্তরের বাতাস বয়ে যায়, সেই বাতাসে লুকিয়ে থাকে রক্তগরম যোদ্ধাদের গল্প, ভাইকিংদের কাহিনি। যুদ্ধ, জাহাজ আর অন্বেষণের মতোই তাদের আরেকটি পরিচিতি ছিল সমৃদ্ধ খাদ্যাভ্যাসের কারণে। ৮০০ থেকে ১১০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত নরডিক অঞ্চলে (ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও ফারো দ্বীপপুঞ্জ এবং স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল আল্যান্ড) বসবাসকারী এই সামুদ্রিক জাতি শুধু যুদ্ধেই পারদর্শী ছিল না; দৈনন্দিন জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় কৃষিকাজ, পশুপালন, সংরক্ষণ, রান্না ও উৎসব—সবকিছুতেই তাদের ছিল আলাদা দক্ষতা। প্রত্নতত্ত্ব, সাহিত্য, ঐতিহাসিক গবেষণা এবং আধুনিক সিনেমা ও ওয়েব সিরিজ (‘ভাইকিংস’, ‘দ্য লাস্ট কিংডম’) ইত্যাদি যেসব সূত্রে আজকাল আমরা ভাইকিংদের জীবনযাত্রা জানতে পারি, সেগুলোতে দেখা যায়, তারা ছিলেন যথেষ্ট পরিমিত ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাসের অনুসারী।
খাবারের ভিত্তি: প্রকৃতি ও জলবায়ুর প্রভাব
স্ক্যান্ডিনেভিয়ার হিমেল প্রকৃতি ভাইকিংদের খাদ্যাভ্যাস গঠনে বড় ভূমিকা রেখেছে। দীর্ঘকালীন শীত, স্বল্পকালীন গ্রীষ্ম এবং কঠোর জলবায়ুর কারণে ফসল ফলানোর সময়কাল ছিল খুব কম। তাই তারা কৃষিকাজের পাশাপাশি শিকার, পশুপালন ও মাছ ধরাকে গুরুত্ব দিতেন। ভাইকিং আবাসস্থলের আশপাশে সাধারণত ভেড়া, গরু, ছাগল, শূকর, হাঁস-মুরগির ছোট খামার থাকত। কোল্ডস্টোরেজ ব্যবস্থা তখন ছিল না; তাই বিভিন্ন ধরনের ধোঁয়া দিয়ে, শুকিয়ে, লবণ যুক্ত করে খাদ্য সংরক্ষণ প্রযুক্তি ছিল তাদের লাইফলাইন। প্রতিবছরের শীতের আগে পরিবারগুলো মাংস জমিয়ে রাখত, যা ছিল তাদের টিকে থাকার প্রধান উপায়। উর্বর জমি কম থাকায় খাবারের একটি বড় অংশ আসত তাজা মাছ, হাঙর, কড, স্যামন, হারিং, সি-ফুড প্রভৃতি সামুদ্রিক সম্পদ থেকে।
মাছ: ভাইকিং ডায়েটের প্রাণ
সিরিজ বা সিনেমায় আমরা ভাইকিং যোদ্ধাদের যতটা তলোয়ার হাতে দেখি, তাদের জন্য ঠিক ততটাই প্রয়োজন ছিল মৎস্য শিকারের দক্ষতা। তারা ছিলেন দক্ষ শিকারি ও জেলে। কারণ, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান উপকূলের মাছ ছাড়া মানুষের পক্ষে জীবনধারণ অসম্ভব ছিল। সবচেয়ে জনপ্রিয় মাছ ছিল স্যামন, কড, হারিং, ফ্ল্যাটফিশ, ইল প্রভৃতি; এগুলো বহুদিন রাখার জন্য শুকানো ও লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করা হতো; বিশেষ করে হারিং ছিল শীতকালীন খাবারের প্রধান উৎস। আজও নরডিক অঞ্চলে এই ঐতিহ্য চলমান। ‘দ্য নর্থম্যান’ চলচ্চিত্রে আমরা দেখতে পাই, ভাইকিং বসতির জীবনধারায় মাছ কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল; যোদ্ধারাও জাহাজে মাছ ধরে খেতেন এবং যাত্রাপথে শুকনো মাছ বহন করতেন। আমরা জানি, প্রত্নতাত্ত্বিক অন্বেষণে (বিশেষ করে বিরকা ও লিন্ডহোমে) প্রচুর মাছের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে, মাছ ছিল ভাইকিংদের প্রধান খাদ্যসঙ্গী।
মাংস ও শিকার: যুদ্ধে পুষ্টির উৎস
মাংস ভাইকিংদের জন্য শুধু খাবার নয়; যারা নিরন্তর সমুদ্রযাত্রা ও যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতেন, তাদের জন্য একপ্রকার শক্তি। তাদের খাদ্যতালিকায় ছিল গরু, ভেড়া, ছাগল, শূকর, ঘোড়া, হরিণ, ভালুক, সিল, বুনো শূকরের মতো নানা বন্য প্রাণীর মাংস। শহর ও গ্রাম—উভয় জায়গাতেই পশুপালন করা হতো। মাংস রান্নার পাশাপাশি ধোঁয়া ও লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করা ছিল ব্যাপক প্রচলিত। শীতের সময় এসব খাবারই ছিল একমাত্র ভরসা। নর্স সাগাগুলোতে (মধ্যযুগীয় আইসল্যান্ডিক সাহিত্যকর্ম) বারবার দেখা যায়, কোনো যুদ্ধ শেষে যোদ্ধারা আগুন জ্বালিয়ে মাংস রান্না করছেন। আইসল্যান্ডিক সাগাতেও উল্লেখ আছে, বড় কাঠের হলে বসে মাংস কাটাকাটি, উদ্‌যাপন করা ছিল দৈনন্দিন রেওয়াজ।
শাকসবজি, বুনো ফল ও দুগ্ধজাত খাবার
ভাইকিংরা মাংসাশী হলেও প্রচুর শাকসবজি খেতেন। শালগম, গাজর, কপি, ধনে, রসুন, বিট, পার্সনিপ, শালগম আর পেঁয়াজের ব্যবহার ছিল ব্যাপক। বুনো ফল যেমন ব্লুবেরি, লিঙ্গনবেরি, ক্লাউডবেরি খাওয়ার চল ছিল। যেসব শাকসবজি কম সময়ে জন্মায় এবং সহজে সংরক্ষণ করা যায়, মূলত সেগুলোর ওপর নির্ভর করত ভাইকিংদের কৃষিজ পদ্ধতি। তাদের গৃহপালিত পশু ছিল প্রচুর। ফলে টক দই, মাখন, চিজ (বিশেষ করে হার্ড চিজ), বাটার, ছানার বিভিন্ন রূপ এবং বাটারমিল্কের মতো দুগ্ধজাত খাবারও ভীষণ জনপ্রিয় ছিল। শুধু খাবারই নয়, কখনো কখনো বিনিময় ব্যবস্থার অংশও ছিল এগুলো। তাদের তৈরি স্কির নামক টক দই জাতীয় খাবার আজও আইসল্যান্ডে বেশ জনপ্রিয়।
রুটি, পোরিজ ও দৈনন্দিন পদ
শস্য ও রুটি ভাইকিংদের খাবারের ভিত্তি গঠন করত। খাদ্যশস্য, বিশেষ করে বার্লি, রাই ও ওটস থেকে তৈরি হতো রুটি। এই রুটিকে অনেক গবেষক ভাইকিং সংস্কৃতির সর্বজনীন খাদ্য বলে উল্লেখ করেন। শস্যের কারণে ভাইকিংদের খাবারে রুটি আর পোরিজের উপস্থিতি ছিল নিয়মিত। তাদের রুটি ছিল আধুনিক রুটির মতো নরম ও মোটা; যথেষ্ট পুষ্টিকর। ছোট ছোট গোলাকারে বানানো, কখনোবা কড়া তাপে পাথরের ওপরে সেঁকা। পোরিজ ছিল সকালের প্রধান খাবার। যবের ময়দা, কখনো সামুদ্রিক লবণ, কখনো বুনো বেরির রস দিয়ে একটু স্বাদ বাড়ানো।
খাদ্য সংরক্ষণ কৌশল: শীত জয়ের বিজ্ঞান
শীতকালের জন্য খাদ্য মজুত করা ছিল ভাইকিংদের টিকে থাকার অন্যতম কৌশল। তারা ধোঁয়া দিয়ে সংরক্ষণ, লবণ ব্যবহার, ফারমেন্টেশন, শুকিয়ে রাখা খাবারের (ড্রাইড ফিশ, জারকি) মতো কৌশল অবলম্বন করতেন। এমনকি সুরস্ট্রমিং নামক দুর্গন্ধযুক্ত ফারমেন্টেড মাছও ব্যবহারের চল ছিল, যা আজও সুইডেনে জনপ্রিয়, যেটির উৎপত্তি ভাইকিং যুগেই।
নারীদের ভূমিকা: ফ্রেইয়া কিচেন
ভাইকিং গৃহস্থালির রান্নার বেশির ভাগ দায়িত্ব নারীরা পালন করতেন। তাদের ভূমিকা ছিল ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ; কারণ, খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বণ্টনে তাদের দক্ষতা ছিল টিকে থাকার মূল চাবিকাঠি। ভাইকিং পুরাণে ফ্রেইয়া হলেন প্রেম ও উর্বরতার দেবী; তার সঙ্গে প্রায়ই খাদ্য, বংশবৃদ্ধি, ভূমির উর্বরতার সম্পর্ক টানা হয়। স্ক্যান্ডিক কবিতায় রান্নাঘরকে বলা হয়েছে ফ্রেইয়া’স হার্থ, যা নারীদের সামাজিক গুরুত্বকে তুলে ধরে।
নর্স সংস্কৃতিতে মধু ও পানীয়
ভাইকিংদের সবচেয়ে প্রিয় পানীয় ছিল মিদ, যা মধু থেকে তৈরি একধরনের কড়া পানীয়। ‘দ্য পোয়েটিক এডা’, ‘প্রোস এডা’ প্রভৃতি বইয়ে লিপিবদ্ধ বিভিন্ন ঘটনায় এর নমুনা পাওয়া যায়। বিশেষ করে কোয়াসিস’র মিডের গল্প তাদের সংস্কৃতিতে কড়া পানীয়ের গুরুত্ব স্পষ্ট করে। পানীয় তালিকায় আরও ছিল আলে (বার্লিতে তৈরি পানীয়বিশেষ), বিয়ার, ফ্রুট ওয়াইন (সীমিত পরিসরে) প্রভৃতি। ভাইকিং যোদ্ধারা যুদ্ধের আগে মিদ পান করতেন, এমন চিত্র ফুটে উঠেছে জনপ্রিয় টিভি সিরিজ ‘ভাইকিংস’-এও।
ভাইকিং ভোজ: রাজা, যোদ্ধা ও আড়ম্বর
উদরপূর্তির পাশাপাশি এ ছিল সামাজিক পরিচয়, ক্ষমতা ও ঐতিহ্যের প্রতীক। রাজা, জার্ল বা চিফটেনরা বড় আয়োজন করতেন সাম্বল বা ব্লোটের সময়। সাম্বল ছিল পানীয়ভিত্তিক এক অনুষ্ঠান, যেখানে যোদ্ধারা শপথ এবং কবিরা সাগা আবৃত্তি করতেন; আর দেবতাদের উদ্দেশে উৎসর্গ করা হতো বিশেষ পানীয়। ব্লোট ছিল ধর্মীয় উৎসর্গমূলক আয়োজন। এ সময়ে পশু উৎসর্গ করে সেটির মাংস ভোজে পরিবেশনের রেওয়াজ ছিল।
খাদ্যের ভেতরেও লুকিয়ে থাকে সভ্যতার গল্প। ভাইকিংদের খাদ্যসম্ভার শুধু পুষ্টির ব্যাপার নয়; ছিল বেঁচে থাকার শক্তি, সামাজিক শ্রেণি, ধর্মীয় বিশ্বাস, ভ্রমণ এবং বাণিজ্যের ইতিহাস ও সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশও। বরফঢাকা উত্তরের সেই যোদ্ধাদের জীবন আজ আমাদের কাছে বিস্ময় আর কৌতূহলে ভরা গল্প। তাদের বাসস্থান, জাহাজ বা যুদ্ধে না তাকিয়ে শুধু একটি রান্নাঘর, হাঁড়ি বা শুকনো মাছের দিকে তাকালেও হয়তো বুঝতে পারব, ভাইকিংদের জীবন কত সংগ্রামী ও বৈচিত্র্যময় ছিল।

 ফুয়াদ রূহানী খান
ছবি: ইন্টারনেট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top