skip to Main Content

বিশেষ ফিচার I মিলেনিয়াল বনাম জেন-জি ফুড কালচার

একই বাড়ি, এক ছাদের নিচে; তবু টেবিলে বসা দুই জগতের বাসিন্দা! মা ভাত-ডাল, মেয়ে রামেন-স্মুদি—খাবার এখন শুধু পেট ভরানোর নয়, প্রজন্মের ভাষা

একই ছাদের নিচে থাকা মানে যে একই রকম খাওয়া—এমন ধারণা এখন আর খাটে না। সকালে যেখান থেকে ভাতের হাঁড়ি নামে, সেই রান্নাঘরেই বিকেলে ব্লেন্ডারে ঘুরে স্মুদি। একদিকে মায়ের প্লেটে গরম ভাত, ডাল আর ভাজা; অন্যদিকে মেয়ের হাতে ল্যাপটপ, পাশে রাখা প্রোটিন বার কিংবা ফলভিত্তিক স্ন্যাক। দৃশ্যটি পরিচিত, তবু আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আলাদা। এই পার্থক্য শুধু খাবারের তালিকায় নয়; মানসিকতায়ও। মিলেনিয়াল প্রজন্মের কাছে খাবার মানে মূলত দিনের ছন্দের অংশ—সময়মতো গ্রহণ, পেট ভরানো, শরীর ঠিক রাখা। আর জেন-জির কাছে খাবার অনেক বেশি পারসোনাল। কখন, কী, কতটুকু খাবে—সবকিছু নিজ প্রয়োজন ও লাইফস্টাইল অনুযায়ী। এখানে নিয়মের চেয়ে স্বাধীনতা বড়।
একই পরিবারের দুই প্রজন্মের এই আলাদা প্লেট আসলে সময় বদলের প্রতিফলন। কাজের ধরন, পড়াশোনার চাপ বদলেছে; বেড়েছে স্ক্রিনে সময় কাটানো। ফলে খাবার আর শুধুই দিনের নির্দিষ্ট বিরতি নয়; অনেক সময় তা হয়ে উঠেছে চলমান জীবনের ফাঁকে নেওয়া সিদ্ধান্ত। কেউ বসে খান, কেউ খেতে খেতেই কাজ চালান। এ ক্ষেত্রে খাবার শুধু পেট ভরানোর বিষয় থাকে না; জেন-জির কাছে তা পরিচয়ের অংশ—তিনি কী খান, কী এড়িয়ে চলেন, কোন ট্রেন্ড ফলো করেন। আর মিলেনিয়াল প্রজন্ম এখনো খাবারকে অভ্যাস ও শৃঙ্খলার জায়গা থেকে দেখে। একই রান্নাঘর তাই আজ দুই রকম দর্শনের সাক্ষী।
ঘরের রান্না বনাম কনভেনিয়েন্স ফুড
মিলেনিয়াল প্রজন্মের খাবারের অভ্যাস গড়ে উঠেছে রুটিনকে কেন্দ্র করে। সকাল, দুপুর ও রাত—এই তিন ভাগে ভাগ করা খাবার তাদের কাছে শৃঙ্খলার প্রতীক। ভাত, ডাল, মাছ বা মাংস—এই কম্বিনেশন শুধু স্বাদের নয়; বরং পরিচিত নিরাপত্তারও বিষয়। বাড়ির রান্না মানেই স্বাস্থ্যকর, এমন বিশ্বাসে বড় হওয়া এ প্রজন্মের কাছে সময়মতো খাবার গ্রহণ শরীর ঠিক রাখার প্রথম শর্ত।
জেন-জি সেই রুটিন ভেঙেছে নীরবে। তাদের খাদ্যাভ্যাস নির্ভর করছে প্রয়োজন আর পরিস্থিতির ওপর। কখনো সকালের নাশতা বাদ পড়ে, কখনো দুপুরের জায়গা নেয় ঝটপট গিলে নেওয়া কোনো স্ন্যাক। রান্নাঘরের হাঁড়ির বদলে এয়ারফ্রায়ার, চুলার বদলে কেটলি, প্লেটের বদলে হাতে ধরা খাবার—এই বদল তাদের কাছে অস্বাভাবিক নয়। সময় বাঁচানো, সহজলভ্যতা আর নিয়ন্ত্রণ—এই তিন বিষয় এখানে মুখ্য। এই প্রজন্মের কাছে খাবার মানে দীর্ঘ সময় ধরে বসে গ্রহণ নয়; বরং অন-ডিমান্ড সমাধান। প্রোটিন বার, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, স্মুদি বা রেডি-টু-ইট অপশন—সবই তাদের ফ্লেক্সিবল লাইফস্টাইলের সঙ্গে মানানসই। কাজের ফাঁকে, ক্লাসের মাঝখানে কিংবা রাত জেগে পড়াশোনার সময় খাবার ঢুকে পড়ে সুযোগ বুঝে।
এই দুই খাদ্যাভ্যাসের পার্থক্য আসলে মূল্যবোধে। মিলেনিয়ালের কাছে নিয়ম স্বাস্থ্য এনে দেয়, আর জেন-জির কাছে স্বাধীনতা। একজনের চোখে যা অগোছালো, অন্যজনের কাছে তা বাস্তবতা। ঘরের রান্না বনাম কনভেনিয়েন্স ফুড—এই দ্বন্দ্ব তাই ভালো-মন্দের নয়; বরং বদলে যাওয়া জীবনের গতির গল্প।
খাবারের মানে বদল যেভাবে
একসময় খাবারের সবচেয়ে বড় কাজ ছিল পেট ভরানো। কী খাওয়া হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল খাওয়া হচ্ছে কি না। মিলেনিয়াল প্রজন্মের বড় হওয়া সেই বাস্তবতায়, যেখানে খাবার ছিল প্রয়োজন, দিনের শক্তি জোগানোর মাধ্যম। স্বাদ ছিল, পছন্দও ছিল; কিন্তু তা ব্যক্তিগত পরিচয়ের ভাষা হয়ে ওঠেনি। ধীরে ধীরে এই ধারণা বদলেছে; বিশেষ করে জেন-জি প্রজন্মের কাছে খাবার এখন সিদ্ধান্ত, অবস্থান এবং কখনো কখনো ঘোষণার মতো। কী খান, কী খান না—এই দুটোই নিজ নিজ জীবনদর্শনের অংশ। ভেজান হওয়া, গ্লুটেন এড়িয়ে চলা, সুগার কমানো বা হাই-প্রোটিন ডায়েট বেছে নেওয়া—সবকিছুই ব্যক্তিগত পছন্দের পাশাপাশি নিজেকে প্রকাশ করার উপায়। এই বদলের পেছনে কাজ করছে তথ্যের সহজলভ্যতা আর বিকল্পের আধিক্য। খাবার শুধু ঘরের চারদেয়ালে সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন সংস্কৃতি ও খাদ্যদর্শন এখন হাতের মুঠোয়। ফলে খাবার বাছাইয়ের সিদ্ধান্তও হয়ে উঠছে সচেতন; কখনো আবেগপ্রবণ, কখনো আদর্শনির্ভর।
দেশি স্বাদ থেকে গ্লোবাল টেস্ট
মিলেনিয়াল প্রজন্মের স্বাদের মানচিত্র আঁকা হয়েছে পরিচিত ঘ্রাণ আর ঘরের হাঁড়ির শব্দে। ভাত-ডাল-মাছের স্বাদ শুধু খাদ্যাভ্যাস নয়; শৈশব, পরিবার আর নিরাপত্তার স্মৃতিও। এই স্বাদে ঝুঁকি কম; অচেনা কিছু নেই। খাবার মানেই জানা স্বাদ, যা শরীর যেমন গ্রহণ করে, মনও তেমন চেনে। জেন-জি সেই পরিচিত ভূগোল পেরিয়ে চলে গেছে অনেক দূরে। তাদের স্বাদের মানচিত্রে ঢুকে পড়েছে বাও বান, রামেন, কোরিয়ান ফ্রাইড চিকেন কিংবা থাই নুডলস। দেশি খাবার বাদ পড়েনি; কিন্তু সঙ্গে জায়গা নিয়েছে নানা দেশের স্বাদ। অচেনা মসলা, ভিন্ন টেক্সচার, নতুন খাওয়ার ধরন—সবই তাদের কাছে একধরনের অভিজ্ঞতা।
এই পরিবর্তনের পেছনে শুধু ভ্রমণ বা রেস্টুরেন্ট কালচার নয়, বড় ভূমিকা রেখেছে স্ক্রিনও। সিরিজ, রিলস আর ভ্লগে দেখা খাবার এখন আর দূরের কিছু নয়। ঘরে বসেই সেই স্বাদ খুঁজে নেওয়ার আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। ফলে খাবার হয়ে উঠছে এমন জানালার মতো, যার ভেতর দিয়ে দেখা যায় অন্য সংস্কৃতি। মিলেনিয়ালের কাছে নতুন স্বাদ মানে মাঝেমধ্যে ভিন্ন কিছু। আর জেন-জির কাছে নতুন স্বাদ মানে স্বাভাবিক কৌতূহল। তারা স্বাদের ভেতর দিয়ে নিজেদের জায়গা খুঁজে নেন, নিজেদের পছন্দ গড়ে তোলেন। ভাত-ডাল-মাছ বনাম বাও বান-রামেন—এই দ্বন্দ্ব তাই দেশি-বিদেশির নয়; বরং পরিচিত আর পরীক্ষামুখী মানসিকতার পার্থক্য।
পুষ্টি বনাম ট্রেন্ড
স্বাস্থ্য নিয়ে মিলেনিয়াল প্রজন্মের ভাবনা বেশ বাস্তব আর ভয়নির্ভর। পরিবারে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা কোলেস্টেরলের গল্প শুনতে শুনতে বড় হওয়ায় তাদের খাদ্যসচেতনতা গড়ে উঠেছে সতর্কতার ভেতর দিয়ে। কী খেলে শরীর ভালো থাকবে—এই প্রশ্নের উত্তর তারা খোঁজেন ডাক্তারের পরামর্শে। চিনি কমানো, তেল বাছাই করা, ক্যালরির হিসাব রাখা—সবকিছুই ভবিষ্যতের ঝুঁকি এড়ানোর চেষ্টা। অন্যদিকে, জেন-জির স্বাস্থ্যসচেতনতার ভাষা একেবারে আলাদা। তারা কথা বলেন ম্যাক্রো, প্রোটিন আর গাট হেলথ নিয়ে। খাবারের গুণাগুণ মাপেন শতাংশে, গ্রামে আর চার্টে। শরীরকে শুধু সুস্থ রাখাই নয়; পারফর্ম করানোর ভাবনাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ—এনার্জি, ফোকাস, ফিটনেস—সবকিছু একসঙ্গে। এই সচেতনতার বড় অংশ তৈরি হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ার ভেতর দিয়ে। রিলসে দেখা ডিটক্স ড্রিংক, ইনফ্লুয়েন্সারের পরামর্শে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং কিংবা হঠাৎ কোনো বিশেষ খাবার বাদ দেওয়া—এসব সিদ্ধান্ত অনেক সময় শারীরিক চাহিদার চেয়ে ট্রেন্ডের গতিতে নেওয়া হয়। স্বাস্থ্য এখানে তথ্যের পাশাপাশি ভিজ্যুয়াল ও ভাইরাল গল্পের ওপরও নির্ভরশীল। এ জায়গাতেই দুই প্রজন্মের ফারাক স্পষ্ট। মিলেনিয়াল প্রজন্ম স্বাস্থ্যকে দেখে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা হিসেবে; আর জেন-জি দেখে নিয়ন্ত্রণ ও অপটিমাইজেশনের সুযোগ হিসেবে।
নতুন প্রজন্মের খাদ্যভাষা
খাবার নিয়ে জেন-জি প্রজন্মের কথাবার্তা অনেক সময় বিজ্ঞানের ভাষার মতো শোনায়। প্রোটিন কত গ্রাম, গাট হেলথ ঠিক আছে কি না, শরীর ডিটক্সে রয়েছে নাকি—এমনটা এখন তাদের দৈনন্দিন আলাপের অংশ। খাবার এভাবে হয়ে উঠেছে মেট্রিক, হিসাব আর ফাংশনের গল্প। এই নতুন খাদ্যভাষা তৈরি হয়েছে তথ্যের সহজ প্রবেশাধিকার থেকে। ইউটিউব ভিডিও, ফিটনেস অ্যাপ, সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট—সব মিলিয়ে খাবার নিয়ে একধরনের টেকনিক্যাল আগ্রহ গড়ে উঠেছে। শরীরকে একটি সিস্টেম হিসেবে দেখার প্রবণতা এখানে স্পষ্ট। কী খেলে শরীর ভালো কাজ করবে, কোন খাবার এড়িয়ে চললে এনার্জি বাড়বে—এই প্রশ্নগুলোই সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে। তবে এই ভাষার বাস্তবতা সব সময় অভিন্ন নয়। প্রোটিন নিয়ে অতিরিক্ত আগ্রহ থাকলেও অনেক সময় সামগ্রিক পুষ্টির বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যায়। ডিটক্স শব্দটি শুনতে যতটা বৈজ্ঞানিক, বাস্তবে এর প্রয়োগ তত স্পষ্ট নয়। গাট হেলথ নিয়ে সচেতনতা বাড়লেও, তার মানে কী—তা অনেকের কাছে অস্পষ্ট থেকে যায়।
এই ফাঁকই নতুন প্রজন্মের খাদ্যভাষার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। তারা জানতে ও বুঝতে চান; কিন্তু সেই জানার পথ অনেক সময় সংক্ষিপ্ত ও ট্রেন্ড-নির্ভর। এটাও সত্য, এই ভাষা খাবারকে প্রশ্ন করার সাহস দিয়েছে। কেন, কীভাবে খাচ্ছি—এসব প্রশ্ন ভবিষ্যতের খাদ্যচর্চাকে নতুন দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
রান্নাঘর থেকে রিলস
একসময় রান্নাঘরের রেসিপি আসত পরিবার আর আশপাশের মানুষের কাছ থেকে। এখন সেই জায়গা দখল করেছে রিলস, শর্ট ভিডিও আর ভাইরাল কনটেন্ট। খাবার তৈরির প্রক্রিয়া শুধু রান্নার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; তা হয়ে উঠেছে দেখার, শেয়ার করার মতো এক অভিজ্ঞতা। কোন খাবার ট্রেন্ডিং, কোনটি ভাইরাল—এমন প্রশ্ন অনেক সময় ঠিক করে দেয়, আজ প্লেটে কী উঠবে। জেন-জি প্রজন্মের খাদ্যাভ্যাসে এর প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্ট। তারা নতুন কোনো খাবারের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন স্ক্রিনের মাধ্যমে। ৩০ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা রেসিপি মুহূর্তেই বাস্তব রান্নায় ঢুকে পড়ছে। এয়ারফ্রায়ার বা ইনস্ট্যান্ট উপকরণে তৈরি ঝটপট খাবার তাই বেশি আকর্ষণীয়; কারণ, এগুলো দেখতে ভালো, বানানোও সহজ। সোশ্যাল মিডিয়া খাবারকে ভিজ্যুয়াল স্টেটমেন্টে পরিণত করেছে। এই প্রভাব শুধু জেন-জির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, মিলেনিয়াল প্রজন্মও এই ঢেউয়ে ভেসে যাচ্ছে, তবে একটু ধীরগতিতে।
হোম কুকিং বনাম ফুড ডেলিভারি
একসময় খাদ্যচর্চার মূলে ছিল বাজার ও রান্না করা আর একসঙ্গে বসে খাওয়া। রান্নাঘর সেই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দু। মিলেনিয়াল প্রজন্ম এই ধারার মধ্যেই বড় হয়েছে। বাইরে খাওয়া ছিল ব্যতিক্রম, বিশেষ উপলক্ষের অংশ। ডিজিটাল যুগে এই চিত্র দ্রুত বদলে গেছে। এখন খাদ্যচর্চার মূলে অনেক সময় স্ক্রিনে কয়েকটি ট্যাপ। জেন-জি প্রজন্মের ফুড অ্যাপ শুধু সুবিধা নয়, বরং স্বাভাবিক অভ্যাসও। সময় কম, কাজ বেশি—এই বাস্তবতায় রান্নার চেয়ে অর্ডার করাই অনেক সময় যুক্তিসংগত মনে হয়। অবশ্য এই পরিবর্তনের ভেতরেও দ্বন্দ্ব রয়ে গেছে। হোম কুকিংয়ে জড়িয়ে আছে নিয়ন্ত্রণ আর যত্নের ধারণা, আর ফুড ডেলিভারির সঙ্গে গতি ও বৈচিত্র্য। মিলেনিয়াল যেখানে ভারসাম্য খোঁজে, জেন-জি সেখানে বেছে নেয় সহজ সমাধান।
একই টেবিলে বসা কমছে কেন
একসময় দিনের সবচেয়ে নিশ্চিত মুহূর্ত ছিল একসঙ্গে বসে খাওয়া। কার কখন খিদে লাগল, সেই প্রশ্নের সুযোগ ছিল না; খাবারের সময় মানে সবাই এক টেবিলে। আজ সেই দৃশ্য ক্রমেই দুর্লভ। এই পরিবর্তনের পেছনে কাজ করছে ভিন্ন ভিন্ন জীবনযাপন। কাজের সময় ও পড়াশোনার চাপের পাশাপাশি স্ক্রিনে কাটানো সময়ও আলাদা। জেন-জি প্রজন্ম অনেক সময় খাচ্ছে নিজের মতো করে—কেউ রাতে, কেউ মাঝপথে, কেউ কাজের ফাঁকে। মিলেনিয়ালরা এখনো একসঙ্গে খাওয়ার গুরুত্ব বোঝেন; কিন্তু বাস্তবতায় সেটি ধরে রাখা সহজ নয়।
ভাঙন নাকি রূপান্তর
বাইরে থেকে মনে হতে পারে, খাবারের সংস্কৃতি ভেঙে যাচ্ছে। ভাতের হাঁড়ি সরছে, একসঙ্গে বসে খাওয়ার দৃশ্য কমছে, পরিচিত স্বাদের জায়গা দখল করছে অচেনা খাবার। কিন্তু একটু গভীরে তাকালে প্রশ্ন বদলে যায়—এ কি সত্যিই ভাঙন, নাকি সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া একধরনের রূপান্তর? প্রতিটি প্রজন্মই নিজ সময় অনুযায়ী খাবারের মানে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করে। মিলেনিয়ালরা যেখানে নিয়ম, নিরাপত্তা আর অভ্যাসকে গুরুত্ব দিয়েছেন; জেন-জিরা বেছে নিচ্ছেন নমনীয়তা, পছন্দ আর অভিজ্ঞতা। এই দুই দর্শন একে অন্যের বিরোধী মনে হলেও, দুটোর উদ্দেশ্য অভিন্ন—নিজের জীবনের সঙ্গে মানানসই থাকা।
খাদ্যসংস্কৃতি কখনো স্থির থাকে না। আগের প্রজন্মের অনেক খাবারই একসময় নতুন, অচেনা ছিল। আজ যেগুলো ভাঙন বলে মনে হচ্ছে, সেগুলোর অনেকটাই ভবিষ্যতে স্বাভাবিক হয়ে যাবে। বদলাচ্ছে রান্নার পদ্ধতি, খাবার সংগ্রহের পথ, খাওয়ার সময়; কিন্তু খাদ্য ঘিরে মানুষের অনুভূতি পুরোপুরি হারিয়ে যাচ্ছে না। এই রূপান্তরের মধ্যেই নতুন প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। কী ধরে রাখা আর কী বদলাতে দেওয়া উচিত? হয়তো সমাধান কোনো এক প্রজন্মের পক্ষে দাঁড়ানো নয়; বরং দুই প্রজন্মের অভ্যাসের মধ্যে সংযোগ খোঁজা।
এক প্লেটে দুই প্রজন্মের স্বাদ
যখন মিলেনিয়ালের ভাত-ডাল-মাছের পরিচিত স্বাদ আর জেন-জির বাও বান-রামেন একই টেবিলে বসে, তখন তা শুধু খাবারের মিল নয়; বরং দুই প্রজন্মের জীবনদর্শনের সংলাপ। এক প্রজন্মের নিয়ম আর পরিচিতি, অন্য প্রজন্মের স্বাধীনতা আর পরীক্ষা—দুটি অভ্যাস একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা না করে বরং পারস্পরিক বোঝাপড়ার জায়গা তৈরি করতে পারে। খাবার ঘিরে পারিবারিক দূরত্ব, স্বাদের ভিন্নতা আছে; কিন্তু একসঙ্গে বসার অভ্যাস, ছোট ছোট আলাপ, মাঝেমধ্যে মিলেমিশে খাওয়ার অভিজ্ঞতা—এসবই হতে পারে সেতুবন্ধন। জেন-জির ফ্লেক্সিবল ইটিং আর মিলেনিয়ালের রুটিন পার্থক্যকে বিপরীত নয়; বরং একধরনের সংযোজন হিসেবে দেখা যেতে পারে।

 সুবর্ণা মেহজাবীন
ছবি: ইন্টারনেট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top