skip to Main Content

মনোজাল I মাস্ট নাকি জাস্ট

নতুন বছর এলেই আয়নায় নিজের মুখ যেন একটু বেশি মনোযোগ দাবি করে। ক্যালেন্ডারের পাতা বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাওয়ার এক অদৃশ্য তাগিদ। ভাবনার কেন্দ্রে জায়গা নেয় ত্বক, মেকআপ আর স্কিন কেয়ার। শপিং লিস্টে একের পর এক সৌন্দর্যপণ্য যোগ; সঙ্গে ক্যালকুলেটরে টাকার হিসাব। কারও কারও জন্য নিঃশব্দ মানসিক চাপ

‘নিউ ইয়ার নিউ মি’ কনসেপ্টে মেকআপ আর স্কিন কেয়ার নিয়ে ভাবতে বসেন সৌন্দর্যসচেতনরা। একে তো আনকোরা, অনন্যা হয়ে ওঠার অলিখিত মানসিক চাপ; সঙ্গে ফেস্টিভ সিজনের একের পর এক মেকওভার—এই দুই মিলে ত্বক হারায় স্থিরতা। হাজারো সমস্যায় হাজিরা দেওয়ায় বাড়ে ঝুঁকি। বছরের প্রথম অধ্যায়ে আবহাওয়ার ভিন্নতাও প্রভাব ফেলে। কারণ, অন্য সময়ের চেয়ে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে তাপমাত্রার পারদ থাকে নিচের দিকে। আবার, আর্দ্রতাও কমে আসে। বাতাস হয়ে যায় শুষ্ক, যা ত্বককে অন্য সময়ের চেয়ে খানিকটা ভিন্ন অভিজ্ঞতা দেয়। সব মিলিয়ে নতুন বছরে স্কিন কেয়ার আর মেকআপ—দুয়ের ক্ষেত্রে অনেকে দুই গালে হাত দিয়ে ভাবতে বসেন! প্রসাধন আর ত্বকযত্নের সবকিছু বদলে নেওয়ার ইচ্ছায়। কিন্তু সেখানে বাদ সাধে বাজেট। কারণ, এত কেনাকাটায় আবশ্যক যে উপাদান, তা হলো টাকা। বিনিময় মূল্য ছাড়া কোনো পণ্য কেনা সম্ভব নয়। আবার, বছরের প্রথম দিকে আগের বছরের শোধ-বোধ আর উপহারের ডালার পরে যথেষ্ট টাকা অনেকের পকেটে থাকে না। কিন্তু উচ্চমূল্যের প্রসাধন কিনতে চাইলে এর বাইরে কোনো উপায় তো নেই। তাই চাহিদা আর ব্যয়কে পাশাপাশি পাল্লায় মাপতে গিয়ে হিসাব মেলে না যখন, তখনই আসে হতাশার গল্প।
এই ন্যারেটিভ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে খুব সহজে মানুষের মনে জায়গা করে নেয়। নতুন লুক, নতুন হেয়ার ডু, স্কিন কেয়ার শেলফের নতুন বিন্যাসে প্লাবিত হয় নিউজফিড। আর সৌন্দর্যসচেতন অথচ বাজেট নিয়ে চিন্তিত, এমন মানুষের জন্য এটি একটি প্রেশারে রূপ নেয়। নতুন প্রোডাক্ট কিনতে না পারায় নিজেকে পিছিয়ে পড়াদের দলের কেউ মনে হতে পারে; যা ব্যক্তিকে ইতিবাচক অনুভূতি থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। আরও কাজ করতে পারে অপরাধবোধ। মনে হতে পারে, সবাই নিজেকে আপগ্রেড করছে; কিন্তু বাজেটস্বল্পতার কারণে পিছিয়ে পড়ছেন শুধু তিনিই। আবার কেউ কেউ এমন সময়ে সিদ্ধান্ত নেন, বিউটি মানেই খরচ। এই ভাবনা থেকে আসা আনএক্সপ্লেইনড অ্যাংজাইটির যন্ত্রণাও কম নয়। নতুন বছর মানে নতুন আমি—এটি একধরনের মিথই বটে। তবে এর প্রভাব বাস্তব। নতুন হওয়া মানেই কিনতে হবে—এই ভাবনা ধারণ করেন জেনারেশন জেডের অন্তত ৮৭ শতাংশ প্রতিনিধি। ফোর্বসে প্রকাশিত একটি জরিপের মাধ্যমে পাওয়া যায় এই তথ্য। এমন যখন পরিস্থিতি, তখন একজন সৌন্দর্যসচেতন মানুষ যদি নিজের চাহিদা অনুযায়ী বিউটি ক্লজেট সাজাতে না পারেন, তাহলে তা দুশ্চিন্তা তৈরি করা অস্বাভাবিক নয়। মনের ওপরে তাতে তৈরি হতে পারে নেতিবাচক প্রভাব।
বিউটি ইনফ্লুয়েন্সারদের কনটেন্টও এই মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনে বিরাট ভূমিকা রাখে। তারা নিয়মিত নানা ধরনের প্রোডাক্ট তাদের ফলোয়ারদের কাছে প্রমোট করেন। এদের অনেকে ব্র্যান্ডের কাছ থেকে পারিশ্রমিক পান কিংবা ফ্রি প্রোডাক্ট গ্রহণ করেন; ফলে ধীরে ধীরে এমন একটি ধারণা স্বাভাবিক হয়ে যায় যে ফ্ললেস স্কিন বা পারফেক্ট লুক পেতে বড়সড় বিউটি কালেকশন দরকার। এই প্রজন্মের ওপরে সরাসরি প্রভাব বিস্তার করে এসব কনটেন্ট। তারা ভাবতে থাকেন, ট্রেন্ডে থাকতে বা যেসব ইনফ্লুয়েন্সারকে তারা অনুসরণ করেন, তাদের মতো হতে হলে এই প্রোডাক্টগুলো কিনতেই হবে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস কোম্পানি লেনডিং ট্রির তথ্যমতে, জেনারেশন জেডের ২৭ শতাংশ প্রতিনিধি বিউটি প্রোডাক্ট কেনার জন্য ঋণের মধ্যে পড়েছেন। বিউটি প্রোডাক্টে অতিরিক্ত খরচ তাদের বাজেটের ওপর চাপ তৈরি করে এবং আর্থিক দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এর পাশাপাশি, বিউটি ইন্ডাস্ট্রি প্রতিনিয়ত নতুন প্রোডাক্ট ও ট্রেন্ড লঞ্চ করছে, ফলে কখনোই শেষ না হওয়া সৌন্দর্যপণ্য ব্যবহারের চক্র তৈরি হয়, যেখান থেকে বের হওয়া সহজ নয়। কিন্তু শুধু যে নতুন প্রসাধনেই নতুন হয়ে ওঠা, তা নয়; বরং ভিন্নভাবেও উদ্‌যাপন করা যেতে পারে এই নতুনত্ব।
 নতুন কিছু কেনার বদলে আগের প্রোডাক্টগুলো শেষ করা;
 টুল কেনার চেয়ে টেকনিক শিখে নেওয়া;
 স্কিন, মাইন্ড আর ওয়ালেট—সবকিছুর প্রতি একটু বেশি মনোযোগী হওয়া;
 ক্লাটার নয়, কেয়ার হিসেবে বিউটিকে নতুন করে চিন্তা করা।
বিভিন্ন ফাইন্যান্সিয়াল প্ল্যানিং গাইডলাইনে বিউটি প্রোডাক্টে খরচ সীমিত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়, যা সাধারণত বার্ষিক আয়ের ২ শতাংশের মধ্যে। সৌন্দর্যচর্চা নিঃসন্দেহে আত্মযত্নের অংশ; কিন্তু সেটি যখন সামাজিক তুলনা, বাজেটের চাপ আর অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেখানে থেমে ভাবা জরুরি। নিজের ত্বক, মন আর আর্থিক বাস্তবতা বুঝে সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়াই প্রকৃত সৌন্দর্যবোধ। সীমিত পণ্যের মাধ্যমেও যত্ন নেওয়া সম্ভব। পুরোনো প্রোডাক্ট শেষ করা, সঠিক টেকনিক শেখা, রুটিনে ধারাবাহিকতা রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় তুলনা এড়িয়ে চলাই হতে পারে নতুন বছরের সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত শুরু। শেষ পর্যন্ত, নতুন বছর মানে নতুন কেনাকাটা নয়; বরং নতুন করে নিজের সঙ্গে সুস্থ, বাস্তবসম্মত ও সহানুভূতিশীল সম্পর্ক গড়ে তোলা হতে পারে সবচেয়ে বড় গ্লো-আপ।

 সারাহ্ দীনা
মডেল: শাকিরা
মেকওভার: পারসোনা
ছবি: জিয়া উদ্দীন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top