ইভেন্ট I ছবি মেলা
সময়ের ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে যখন পৃথিবী বারবার ধ্বংস ও পুনর্গঠনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, তখন ‘আবার নতুনভাবে শুরু করা’ হয়ে উঠেছে জরুরি এক তাগিদ। এই অনুভব থেকে এশিয়ার প্রথম আন্তর্জাতিক আলোকচিত্র উৎসব ছবি মেলা তার ১১তম সংস্করণ আয়োজন করেছে
ছবি মেলার চলতি আসরের থিম ‘পুনঃ (Re)’। ২৫ বছর ধরে দৃক পিকচার লাইব্রেরি ও পাঠশালা সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইনস্টিটিউট যৌথভাবে এই উৎসব আয়োজন করে আসছে। বিশ্বজুড়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক আলোকচিত্র উৎসবগুলোর একটি হিসেবে স্বীকৃত এটি। ঢাকায় প্রতি দুই বছর পর অনুষ্ঠিত উৎসবটির এবারের আসর চলেছে ১৬ থেকে ৩১ জানুয়ারি; বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দো ঢাকা, দৃকপাঠ ভবন এবং বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সাউথ প্লাজায়। গ্যালারির চার দেয়াল ছাড়িয়ে জনপরিসরে ছড়িয়ে পড়াই ছবি মেলার অন্যতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।
এবারের থিম ‘পুনঃ’-এর আভিধানিক অর্থ ‘আবার’; অন্তর্নিহিত অর্থে নতুন করে কিংবা অন্যভাবে শুরু করার দৃষ্টিভঙ্গি। তবে এই পুনরাবৃত্তি সরল নয়; বরং ধ্বংস ও পুনর্গঠনের মাঝে একটি বিরাম কিংবা স্তব্ধতা। অথবা বলা যায় একটি ছেদ, একটি জিজ্ঞাসা; অতীত ও বর্তমানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নতুন করে দেখার প্রয়াস।
সংঘাত, সহিংসতা, বাস্তুচ্যুতি ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের সময়ে লেন্সভিত্তিক চর্চায়, ছবির একধরনের দ্বৈততা দর্শকের সামনে আসে। এই জটিল বাস্তবতাকে অনুসন্ধান করেছে ছবি মেলা ২০২৬। এই সংস্করণে অংশ নেন পাঁচ মহাদেশের ১৮ দেশের ৫৮ জন শিল্পী।
মোট নয়টি প্রদর্শনীর মধ্যে তিনটি ছিল একক; বাকিগুলো দলীয়। উৎসবটি যৌথভাবে কিউরেট করেছেন আর্টিস্টিক ডিরেক্টর মুনেম ওয়াসিফ ও সরকার প্রতীক। তাদের সঙ্গে আমন্ত্রিত কিউরেটর ছিলেন তানভি মিশ্রা ও সোহরাব জাহান এবং সহযোগিতায় ইয়াসমিন ইদ সাব্বাহ।
একক প্রদর্শনীর মধ্যে আলেসান্দ্রা সাঙ্গুঁইনেতির ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চারস অব গুইল অ্যান্ড বেলিন্ডা অ্যান্ড দ্য এনিগম্যাটিক মিনিং অব দেয়ার ড্রিমস’ দীর্ঘ সময় ধরে দুই নারীর বেড়ে ওঠার গল্প বলে।
এখানে শৈশবের কল্পনা যেন ধীরে ধীরে বাস্তব জীবনের দায়িত্বে রূপ নিয়েছে। বানি আবিদির কাজ রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও পুরুষতান্ত্রিক ভঙ্গিমার নাটকীয়তার উন্মোচন ঘটিয়েছে ব্যঙ্গাত্মক ও নিগূঢ় প্রশ্নবাণের মাধ্যমে।
‘দ্য রোমান্টিক ডকুমেন্টারিয়ান’ প্রদর্শনীতে কিংবদন্তি আলোকচিত্রী আমানুল হকের কাজ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, গ্রামীণ জীবন ও মানবিক সংবেদনশীলতার এক অনন্য ভিজ্যুয়াল দলিল হয়ে উঠেছে।
ছবি মেলার দলীয় প্রদর্শনীগুলোতে উঠে এসেছে সমসাময়িক বিশ্বের জরুরি প্রশ্নগুলো। ‘বাট আ উন্ড দ্যাট ফাইটস’ ফিলিস্তিনি কবি মাহমুদ দারবিশের কবিতা থেকে অনুপ্রাণিত।
ক্ষত কেবল শোক নয়, প্রতিরোধের ভাষা হিসেবে ফুটে উঠেছে এই সিরিজে। বাস্তুচ্যুতি, নিখোঁজ মানুষ, স্মৃতি ও শরীর এখানে সাক্ষ্য দেয়। ‘ইফ দ্য ল্যান্ড কুড স্পিক’ প্রদর্শনীতে ভূমি নিজেই যেন কথা বলে।
সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ, ফিলিস্তিনের জলপাই বাগান কিংবা ধ্বংসপ্রাপ্ত খনির ভেতর দিয়ে প্রকৃতি ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক প্রকাশ পেয়েছে এই সিরিজে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে তৈরি হয়েছে ‘উইমেন ইন দ্য জুলাই আপরাইজিং: এসেনশিয়াল দেন—হোয়াই ইরেজড নাউ?’ সিরিজ।
প্রদর্শনীটি ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নারীদের ভূমিকা এবং পরবর্তী সময়ে তাদের ক্রমাগত মুছে যাওয়ার রাজনীতিকে সামনে এনেছে।
এই সিরিজ স্পষ্ট প্রশ্ন তুলেছে—বিপ্লবের সময়ে নারীরা অপরিহার্য; কিন্তু ক্ষমতা পুনর্বিন্যাসের সময় কেন তারা অদৃশ্য? সীমান্ত ও যাতায়াতের রাজনীতি নিয়ে তানভি মিশ্রার কিউরেট করা ‘রাইটস অব প্যাসেজ’ দর্শকের মনে গেঁথে দিয়েছে ভাবনা—কে চলবে, কে আটকে থাকবে, আর এই নিয়ম কে বানায়!
আলোকচিত্রের বাইরে ‘(আন)লার্নিং প্যালেস্টাইন, এমবডিং সলিডারিটি’ নামেও একটি গ্যালারি রাখা হয়েছিল, যেখানে ফিলিস্তিনকে বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে দেখানোর প্রয়াস দৃশ্যমান হয়েছে। ছবি মেলা ২০২৬ রূপ নিয়েছিল সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মিলনক্ষেত্রে।
আয়োজনে আরও জায়গা পেয়েছে শিল্পীদের আলোচনা, প্যানেল, লেকচার ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনী। পাঠশালার উদ্যোগে ছয়টি ইনটেনসিভ ওয়ার্কশপ এবং এক হাজারের বেশি শিক্ষার্থীকে যুক্ত করে স্কুল প্রোগ্রাম এই উৎসবকে যেমন ঋদ্ধ করেছে; তেমনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে সংযোগ ঘটানোর এনে দিয়েছে সুযোগ।
নাঈমা তাসনিম
ছবি: সংগ্রহ
