পাতে পরিমিতি I লাভ সাপোর্টিভ ডায়েট
ভালোবাসা ও খাদ্য—মন ও শরীরের খোরাক হিসেবে মানুষের জীবনে অঙ্গাঙ্গি জড়িয়ে। বিশেষ যত্ন নেওয়া চাই উভয়েরই। তাতে দুটোকে এক পাত্রে মিশিয়ে দিতে পারলে মন্দ হয় না! রইল পুষ্টিবিদ নিশাত শারমিন নিশির পরামর্শ
ভালোবাসা দিবস মানেই ফুল, কার্ড আর নানা রকমের গিফটের সমাহার। প্রিয়জনের কাছ থেকে যেকোনো উপহার পেতে ভালো লাগে সবারই। আর প্রিয়জনের কাছে নিজেকে দারুণভাবে উপস্থাপন করতে হলে চাই ফিটনেস। নিজে সুস্থ থাকা চাই ভেতর থেকে; সেই সৌন্দর্য ফুটে উঠবে ভেতর-বাহির—সব ক্ষেত্রে। আমরা যা খাই, যা করি অর্থাৎ আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস ও লাইফস্টাইল একান্ত ব্যক্তিগত সম্পর্ককে সুস্থ ও সুস্থির রাখার নিশ্চয়তা বাড়াতে পারে বহুগুণ।
থাকুক খেয়াল
ভালো থাকতে গ্যাজেট নিয়ে রাত জাগা বন্ধ করা চাই! সঠিক সময়ে ঘুমানো এবং ঘুম থেকে ওঠা—উভয় চর্চাই আমাদের মেটাবলিজমকে প্রভাবিত করে। তাই অকারণে রাত না জেগে ভোরের সুন্দর সতেজ বাতাস গ্রহণ করা শ্রেয়।
ডিনারের পরও হালকা নাশতা খাওয়ার অভ্যাস অনেকের। এই বাড়তি ক্যালরি শরীরে জমে ওজন বাড়ায়, কোলেস্টেরল ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি তৈরি করে। তাই যথাসম্ভব এমন অভ্যাস পরিত্যাগ উত্তম।
চা-কফি ছাড়া যাদের চলেই না, তারা অন্তত খালি পেটে এমন পানীয় গ্রহণ বন্ধ করুন। সারা রাত দারুণ ঘুমের পর খালি পেটে ক্যাফেইন গ্রহণ শরীরকে বিষাক্ত করে দেয়। তাতে অ্যাসিডিটি ও ডিহাইড্রেশন হতে পারে। তাই ক্যাফেইন যদি গ্রহণ করতেই চান, অল্প পরিমাণে, মধ্য সকাল বা বিকেলকে বেছে নিতে পারেন।
প্রেমে খাদ্যযোগ
খাবারের মাধ্যমে আমরা গ্রহণ করি কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ভিটামিন, মিনারেলস ইত্যাদি। প্রতিটি খাবারের গুরুত্ব আলাদা। কিছু খাবার রয়েছে, যা নিয়ন্ত্রণ করে আমাদের হরমোন, ভালো রাখে হৃদ্যন্ত্র, মুড রাখে চাঙা। সেগুলোকে লাভ সাপোর্টিভ ফুড বলা যেতে পারে। এগুলো গ্রহণে স্ট্রেস কমে; প্রেমানুভূতি বাড়ে।
ভালোবাসার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন হরমোন; যেমন সেরোটোনিন, ডোপামিন, অক্সিটোসিন প্রভৃতিকে সাপোর্ট করে যে ধরনের ফুড, সেগুলো রাখা চাই প্রাত্যহিক খাদ্যতালিকায়।
সেরোটোনিন
অনেক সময় নির্দিষ্ট কোনো কারণ ছাড়াই দেখা দেয় বিষণ্নতা, সবকিছুতে লাগে বিরক্ত, সম্পর্ক নিয়ে অসন্তুষ্টি; যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ব্যক্তিগত সম্পর্কে। সেরোটোনিন হলো ভালো থাকার হরমোন। সাধারণত হরমোন নিয়ে আমরা খুব একটা সচেতন থাকি না; অথচ সেরোটোনিন কমে গেলে দেখা দেয় বিবিধ সমস্যা। তাই তালিকায় রাখতে পারেন সেরোটোনিন বাড়ানোর খাদ্য; যেমন কলা, ডার্ক চকলেট, ওটস, দুধ, বাদাম ইত্যাদি।
ডোপামিন
মুড ভালো থাকলে আচরণ হয় সুন্দর, আর সুন্দর আচরণে সম্পর্ক থাকে চমৎকার। প্রিয় মানুষকে দেখলে ভালো লাগাটা যেমন জরুরি, তেমনি প্রয়োজন তার প্রতি আকর্ষণ অনুভব করা। এসব ক্ষেত্রে যে হরমোন কাজ করে, সেটি ডোপামিন। আনন্দ অনুভবের এই হরমোন প্রেমের অনুভূতিতে বড় ভূমিকা রাখে। তাই ডোপামিন ভালো রাখতে তালিকায় রাখা চাই প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার; যেমন মাছ, ডাল, ডিম, নাটস, সিডস ইত্যাদি।
অক্সিটোসিন
এর আরেক নাম লাভ হরমোন। প্রিয়জনের সঙ্গে বন্ধন ধরে রাখতে অক্সিটোসিন বেশ সাহায্য করে। এই হরমোন নিঃসরণকারী পিটুইটারি গ্রন্থিকে উদ্দীপিত করে, এমন খাবার রাখা চাই প্রাত্যহিক খাদ্যতালিকায়। ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার; যেমন লেবু, কমলা, কিউই, স্ট্রবেরি, ক্যাপসিকাম ইত্যাদির পাশাপাশি ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, ম্যাগনেশিয়াম ও পটাশিয়ামও অক্সিটোসিন বাড়াতে সাহায্য করে। এই পুষ্টি উপাদানগুলো পেতে খেতে পারেন অ্যাভোকাডো, কলা, পালংশাক, বাদাম, টুনা ফিশ, ডিমের কুসুম, চিয়া সিড, মাশরুম, ইয়োগার্ট ইত্যাদি।
যত্নে হৃদ্যন্ত্র
শুধু ভালোবাসা দিবসে নয়; হৃদয় তথা হৃদ্যন্ত্রের যত্ন নেওয়া চাই প্রতিনিয়ত। হার্ট যদি সুস্থ থাকে, তাহলে প্রিয় মানুষের সঙ্গে জীবনের সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নেওয়া সহজ হয়। আর হৃদ্যন্ত্র ভালো রাখতে জমতে দেওয়া যাবে না কোলেস্টেরল। খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দেওয়া চাই অতিরিক্ত চর্বি, বিশেষ করে স্যাচুরেটেড ফ্যাট সমৃদ্ধ খাবার; যেমন গরু বা খাসির চর্বিযুক্ত মাংস, চামড়াসহ মুরগি, ঘি, মাখন, ডালডা, মার্জারিন, অতিরিক্ত ভাজাপোড়া, বাইরের খাবার, অতিরিক্ত চিনি, রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেট ইত্যাদি।
হৃৎপিণ্ড ভালো রাখতে বেছে বেছে কিছু খাবার যেমন বর্জন করা শ্রেয়, তেমনি কিছু জুড়ে নেওয়া চাই।
ফাইবার
রক্তের এলডিএল (লো-ডেনসিটি লিপোপ্রোটিন) হলো ব্যাড কোলেস্টেরল। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় যথেষ্ট ফাইবারের অন্তর্ভুক্তি এই কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। শাকসবজি, ফল, ডাল, ওটস, লাল চাল ইত্যাদি এর যথেষ্ট ভালো উৎস।
ওমেগা ৩ ফ্যাটি অ্যাসিড
হৃৎস্পন্দন ও রক্তনালির সুস্থতায় সহায়ক এই পুষ্টি উপাদান প্রতিদিন না হলেও সপ্তাহে অন্তত তিন দিন খাদ্যতালিকায় রাখা জরুরি। তাই খেতে পারেন সামুদ্রিক মাছ, তিসি বীজ, চিয়া সিড, আখরোট ইত্যাদি।
গুড ফ্যাট
পলি আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট মানেই গুড ফ্যাট। খাদ্যতালিকায় এ ধরনের ফ্যাট থাকলে রক্তের খারাপ কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে; যা পাওয়া যায় অলিভ অয়েল, সরিষার তেল, বাদাম ইত্যাদি থেকে। এইচডিএল (হাই-ডেনসিটি লিপোপ্রোটিন) অর্থাৎ গুড কোলেস্টেরল বাড়াতে তাই খেতে পারেন কাঁচা বাদাম ভর্তা।
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট
রক্তনালির ক্ষতি কমাতে রঙিন ফল, সবজি, বেরি, টমেটোর জুড়ি নেই। হার্ট ফ্রেন্ডলি এ ধরনের খাবার রাখা প্রয়োজন সব সময়।
পটাশিয়াম
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে ভালো থাকে না হার্ট। কলা, কমলা, নারকেল পানি হলো পটাশিয়ামের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট উৎস। রক্তে পটাশিয়াম যথেষ্ট পরিমাণে থাকলে সোডিয়াম অনেকটা নিয়ন্ত্রণে থাকে। সে ক্ষেত্রে রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে এই ধরনের পটাশিয়ামযুক্ত ফল ও সবজি খাদ্য তালিকায় থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে মধ্য সকালে বা বিকেলে ট্রান্সফ্যাট যুক্ত শিঙাড়া বা ভাজাপোড়া না খেয়ে বরং পটাশিয়ামসমৃদ্ধ ফল বা স্যালাদ গ্রহণ করতে পারেন।
ম্যাগনেশিয়াম
হৃৎপিণ্ডের পেশি শিথিল রাখতে সাহায্য করে ম্যাগনেশিয়াম। বাদাম, বীজ, ডাল, শাক প্রভৃতি এর ভালো উৎস।
ফোলেট, ভিটামিন বি ও ডি
হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক এই ধরনের পুষ্টি উপাদান। প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ মিনিট সূর্যের আলোতে থাকা গেলে এবং খাদ্যতালিকায় সবুজ শাক, ডাল, ডিম, মাছ রাখতে পারলে হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমে।
ব্যবস্থাপনায় বর্জন ও অর্জন
যেকোনো বিশেষ দিনেই আমরা সাধারণত যে ভুলগুলো করি, সেগুলো অবশ্যই বাদ দেওয়া চাই।
অনেকের কাছে ভ্যালেন্টাইনস ডে মানেই মিষ্টিমুখ করা। ভালোবাসার মানুষটি যতই মিষ্টি হোক, খাবারের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া চাই বাড়তি ক্যালরি। অতিরিক্ত চিনিজাতীয় খাবার গ্রহণ মোটেই স্বাস্থ্যকর নয়। চকলেট, কেক, সফট ড্রিংকস এক দিনে বেশি গ্রহণ করা হলে সাময়িক আনন্দের পর নেমে আসতে পারে ক্লান্তি; এ ছাড়া মুড ডাউন হওয়ার শঙ্কা বাড়ে।
ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে ভালোভাবে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে শুধু সুন্দর কথা নয়; দরকার আরও কিছু। বিশেষ কিছু বিষয়ে দেওয়া চাই গুরুত্ব।
ঘুম
শরীর ও মন—দুটোই ভালো রাখার জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রাম প্রয়োজন। ঘুম কম হলে সারা দিন মেজাজ খিটমিট থাকে। সে ক্ষেত্রে প্রিয়জনের সঙ্গে সম্পর্ক যতই মধুর হোক, ভালো কথাও ভালো লাগে না! তাই রাতে ভালো ঘুম জরুরি।
সুষম খাবার
আমাদের ব্রেনের একমাত্র শক্তি জোগান দেয় গ্লুকোজ। অনেকে মুটিয়ে যাওয়ার ভয়ে পর্যাপ্ত ক্যালরি গ্রহণ করেন না। সে ক্ষেত্রে না খেয়ে মুড হয় খারাপ; আর ভালোবাসার মানুষটির সঙ্গেও থাকে না সুন্দর আচরণ। মনে রাখা ভালো, সুষম খাবার হরমোন ও আবেগের ভারসাম্য রক্ষা করে। তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রাখা চাই পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার।
পানি
অনেকে সারা দিনের পানি পানের বিষয়ে সচেতন থাকেন না। পানিশূন্যতা মানে ক্লান্ত শরীর ও মন। তাই ফুরফুরে মেজাজ আর গ্লোয়িং স্কিনের জন্য প্রতিদিন পান করা চাই ৮ থেকে ১০ গ্লাস পানি।
হৃদয়ের গভীরে ভালোবাসা পৌঁছাতে প্রয়োজন সুস্থ দেহ। এই ভ্যালেন্টাইনস ডেতে ভালোবাসাকে শুধু এক দিনের উদ্যাপনে সীমাবদ্ধ না রেখে, প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত করা মঙ্গল। প্রিয় মানুষকে দেওয়া চাই এমন খাবার, যা শরীর রাখে সুস্থ, মন করে শান্ত আর সম্পর্ককে করে আরও গভীর ও স্থিতিশীল।
লেখক: প্রধান পুষ্টিবিদ ও বিভাগীয় প্রধান, পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা
ছবি: ইন্টারনেট
