skip to Main Content

ফিচার I মাতাল সমীরণে

আমুদে সময় ফাল্গুন। বিদায় নেয় মাঘের কনকনে শীত। প্রকৃতি ফিরে পায় রং। বাতাসে ছড়ায় সদ্য ফোটা ফুলের সুরভি। হঠাৎ নাকে এসে ধরা দেয় চিরপরিচিত বুনোফুলের ঘ্রাণ। অতঃপর নিজেরই হয়ে উঠতে ইচ্ছা করে সেই ঘ্রাণের উৎস। সুগন্ধির এক শিশি থেকে আরেক শিশিতে মন খুঁজে ফেরে প্রকৃতির সেই অদৃশ্য উপহার। আবৃতি আহমেদের বয়ানে বিস্তারিত

ঘ্রাণ, অদৃশ্য এক ইন্দ্রিয়। চোখে দেখা যায় না। উপায় নেই হাতের মুঠোয় আটকে ফেলার। শুধুই অনুভূতি। মানব মস্তিষ্কের যে অংশ আবেগ তৈরি, যুক্তি বিবেচনা এবং স্মৃতি ধারণ করে, বিজ্ঞানের ভাষায় সেই অংশের নাম লিম্বিক সিস্টেম। ঘ্রাণের অনুভূতি সরাসরি এর সঙ্গে যুক্ত। তাই মনের ওপর ঘ্রাণের প্রভাব স্পষ্ট। সুবাসে মুহূর্তেই ভালো হয় মন।
ঘ্রাণ নিয়ে জল্পনাকল্পনার কমতি ছিল না কোনো কালেই। প্রকৃতির বিভিন্ন সৌরভকে শুরু থেকে আয়ত্তে নিতে চেয়েছে মানুষ। পানিতে, ধোঁয়ায়, ফেনায়, তেলে এমনকি পাথরেও সৌরভ আটকানোর চেষ্টা চলেছে। সুগন্ধির প্রথম ধারণা এসেছিল আতর থেকে। প্রায় ৫ হাজার বছর আগে প্রাচীন ভারত এবং মধ্যপ্রাচ্যে তৈরি হতো। প্রাকৃতিক উপকরণের ঘ্রাণকে পাতনপ্রক্রিয়ায় আটকে ফেলা হতো গন্ধহীন তেলে। ব্যবহৃত হতো না অ্যালকোহল। প্রক্রিয়াটি নিখুঁত করেছিলেন পারস্যের বহুবিদ্যাবিশারদ ইবনে সিনা, যা আজও বহাল। মোগল আমলে আতরের জন্য বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল ভারতের কনৌজ। ডাকা হতো সুগন্ধির রাজধানী।
আধুনিক সুগন্ধি বা পারফিউমের সন্ধান মেলে প্রাচীন সাইপ্রাসে। ব্যাবিলনে মেসোপটেমীয় সভ্যতার তৈরি প্রায় ৪ হাজার বছর পুরোনো একটি সুগন্ধি কারখানার সন্ধান পেয়েছিলেন প্রত্নতত্ত্ববিদেরা। লন্ডনের দ্য পারফিউম সোসাইটির তথ্যমতে, বিশ্বের প্রথম সুগন্ধি প্রস্তুতকারক ছিলেন মেসোপটেমীয় এক নারী। নাম, তাপুতি বেলাতেকাল্লিম। ৩ হাজার বছরের বেশি সময় আগে উদ্ভিদ থেকে সুগন্ধি তেল নিষ্কাশনের কৌশল নথিভুক্ত করে রসায়নবিদ হিসেবে পরিচিতি পান তিনি।
খ্রিস্টপূর্ব ১,০০০ অব্দে গাছের ডাল-পালা, ফুল-পাতা দিয়ে সুগন্ধি তৈরি করত মিসরীয়রা। কথিত আছে, জুলিয়াস সিজার হত্যাকাণ্ডের পর তার জেনারেল ও নিজের প্রেমিক মার্ক অ্যান্টনিকে যে নৌকায় চড়ে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন মিসরের রানি ক্লিওপেট্রা, সেটির পাল ছিল সুগন্ধি সিক্ত। সুগন্ধির সীমা ক্লিওপেট্রার বলয় কিংবা মিসরের গণ্ডিতে আটকে থাকেনি; পৌঁছে গিয়েছিল প্রাচীন গ্রিস, রোম আর ফ্রান্সেও। তখন থেকে তরল, কঠিন, বায়বীয় নানা উপায়ে তৈরি হতে থাকে পারফিউম। চলতে থাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা।
বিশ্বের প্রথম তরল সুগন্ধি উদ্ভাবনের কৃতিত্ব প্রাচীন গ্রিকদের। সতেরো শতকের ফ্রান্সে জনপ্রিয় আনুষঙ্গিকে পরিণত হয় এটি। সে সময় শরীরের দুর্গন্ধ ঢাকতে সুগন্ধির ব্যবহারের চল ছিল। যুক্তরাজ্যের অষ্টম হেনরি ও রানি প্রথম এলিজাবেথের শাসনামলে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো পারফিউম। ছিটানো হতো জনসমাগমস্থলেও। পশ্চিমা বিয়ের কনের হাতের ফুলের বুকে আবিষ্কৃত হয়েছিল সুগন্ধের প্রয়োজনে।
উনিশ শতকে পারফিউম একটি শিল্পে পরিণত হয়। রুচির পরিবর্তন এবং রসায়নবিজ্ঞানের উন্নয়ন আধুনিক সুগন্ধির শিল্পের ভিত্তি স্থাপন করে। শুরুতে সাধারণত একক ফুলের ঘ্রাণ থেকে তৈরি হতো। তবে সময়ের সঙ্গে জটিল হয়েছে প্রক্রিয়া। অকৃত্রিমের পাশাপাশি কৃত্রিম রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করে তৈরি হয় এ যুগের পারফিউমগুলো। ১৯২১ সালে, প্রথমবারের মতো আধুনিক রসায়ন নীতিতে কৃত্রিম উপাদান অন্তর্ভুক্ত করে একটি পারফিউম তৈরি করে ফরাসি ফ্যাশন ব্র্যান্ড শ্যানেল। ফুলেল, সৌরভময় এই পারফিউম সারা বিশ্বে সাড়া ফেলে। এর পেছনে ছিল সাংবাদিকের সাধারণ প্রশ্নে মার্কিন কিংবদন্তি মেরিলিন মনরো দেওয়া অসাধারণ উত্তর। এই তারকার কাছে প্রশ্ন ছিল, ‘রাতে কী পরে বিছানায় যান?’ মনরো জবাব দিয়েছিলেন, ‘শ্যানেল নাম্বার ফাইভ’।
সময়ের সঙ্গে পারফিউমে দেখা গেছে দেশভিত্তিক প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক সত্তা ধরে রাখার প্রয়াস। জাপানিরা চেরি ব্লসম বা সাকুরা, মাচা, রাইস মিল্ক, ইউজার মতো জনপ্রিয় ফুল-ফল আর খাবারের গন্ধগুলো বোতলে বন্দি করেছে। অন্যদিকে দারুচিনি, লবঙ্গ, এলাচি, জাফরান ইত্যাদি বিভিন্ন মসলার ঘ্রাণকে সুগন্ধিতে রূপ দিয়েছেন ভারতীয় উপমহাদেশের সুগন্ধি প্রস্তুতকারকেরা। মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমির দেশগুলোতে প্রাধান্য পেয়েছে আউদ, কস্তুরী, কিশমিশ, গোলাপ, অ্যাম্বার ও চন্দনের ঘ্রাণ। যুগ যুগ ধরে পৃথিবীময় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রকৃতির সুন্দর ঘ্রাণগুলো তুলে এনেই তৈরি হয়েছে মানুষের ব্যবহার উপযোগী পারফিউম।
বাছাই ব্যবস্থাপনা
প্রকৃতির পরিবর্তিত রূপের প্রভাব পড়ে মানুষের সুগন্ধি বাছাইয়ের ওপর। ঋতু পরিবর্তনে তাই বদলে যায় সৌরভের আকাক্সক্ষা। ফুল ফোটার ঋতু এলে ফুলের ঘ্রাণই ভালো লাগে অনেকের। ফ্রান্সের বিউটি ব্র্যান্ড আইজেনবার্গ প্যারিসের অফিশিয়াল ব্লগের মতে, উষ্ণ ও রৌদ্রোজ্জ্বল বসন্তের দিনে ব্যবহারের জন্য পারফিউম বেছে নিতে পারেন নির্দিষ্ট কিছু উপায়ে।
শীত বিদায়
শীতের সময় শরীরের তাপমাত্রা কমে যায় এবং ত্বক কম তেল উৎপন্ন করে। ফলে সুগন্ধি ধরে রাখতে কড়া সৌরভের পারফিউম ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু বসন্ত এলে পরিবর্তিত হয় চাহিদা। সেই পারফিউম পরবর্তী শীতের জন্য তুলে রাখা যেতে পারে।
নবপল্লব
প্রিয় কোনো ফ্লোরাল স্মেল, সাইট্রাস এবং আর্দি টোন বসন্তের সঙ্গে সহজে মানানসই। এ সময় সতেজ ও বাতাসের মতো হালকা পারফিউম বেছে নেওয়া ভালো।
ফ্র্যাগরেন্স নোট
প্রতিটি পারফিউমে সাধারণত তিন স্তরের নোট থাকে। টপ নোট হচ্ছে প্রথম যে ঘ্রাণ অনুভূত হয়। এই নোট মিলিয়ে গেলে যে ঘ্রাণ থাকে, তা হার্ট নোট; আর অনেকটা সময় পেরিয়ে যে ঘ্রাণ থেকে যায়, সেটি বেস নোট। এই তিন বিষয় বিবেচনায় রাখলে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে সহজে।
পঞ্চেন্দ্রিয় মেনে
এমন একটি পারফিউম বেছে নেওয়া যেতে পারে, যা বসন্তের ফুল-ফল-মূলের সৌরভের পাশাপাশি অনুপ্রেরণা জোগাবে। অব্যক্ত ব্যক্তিত্বের ঘটাবে প্রকাশ। এ ক্ষেত্রে নারীদের জন্য মৃদু ও ফুলেল এবং পুরুষদের জন্য সাইট্রাস ও সতেজ ঘ্রাণ বেশ মানানসই।
চাহিদা চক্র
সুগন্ধি ব্যবহারের আগে পরিবেশ, খাদ্যাভ্যাস এমনকি বিবেচনায় থাকতে পারে আবহাওয়াও। কারণ, ঘ্রাণ কতটা তীব্র এবং কতক্ষণ স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করে পরিবেশের ওপর। রাতের আড্ডা নাকি অফিসে, উপলক্ষ বিবেচনায় বাছাই করা যেতে পারে পারফিউম।
হালের হাওয়া
বর্তমান বিশ্বে পারফিউমের জন্য জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে শ্যানেল, ডিওর, গুচি, টমফোর্ড, ভারসাচি, আরমানি ইত্যাদি পশ্চিমা ব্র্যান্ড। বাংলাদেশেও রয়েছে এগুলোর ক্রেতামহল। আমরা সময়ে-অসময়ে তবু খুঁজে ফিরি নিজস্ব প্রকৃতির ঘ্রাণ। বৃষ্টি, ভেজা মাটি, কুয়াশা, নদীর পাড়ের হাওয়া, ধোঁয়া ওঠা চা অথবা পোড়ামাটির ঘ্রাণ খোঁজে মন। এসব সৌরভ জাতিগত পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে।
আমাদের চিরচেনা ঘ্রাণগুলো দিয়ে পারফিউম তৈরি করেছে দেশীয় পারফিউম ব্র্যান্ড শিকড়। এ পর্যন্ত চারটি ভিন্ন সৌরভের পারফিউম তৈরি করেছে ব্র্যান্ডটি। শুকনা মাটিতে বৃষ্টির প্রথম স্পর্শ, বর্ষাকালের কদম ফুল, কাঁচা বাঁশের সুবাস নিয়ে তৈরি সুগন্ধির নাম ‘আষাঢ়’। সদ্য তোলা কচি চা-পাতা, সাতকরার ঘ্রাণের পারফিউমের নাম ‘সিলেট’। পুরান ঢাকার জাফরান, চন্দন ও মসলার সুবাস বন্দি হয়েছে শিকড়ের ‘ঢাকা’ নামক পারফিউমে। মুক্তিযুদ্ধের উদ্যম ও গর্বের সুবাস আছে ব্র্যান্ডটির ‘ফ্ল্যাগ ১৯৭১’ সুগন্ধিতে। আন্তর্জাতিক আঙ্গিকে দেশেই পারফিউম তৈরি করছে বাংলাদেশি ব্র্যান্ড জোনাকি ও ক্যালিওরা।
প্রতিমুহূর্তে জুড়ে থাকে ভিন্ন ভিন্ন ঘ্রাণ। দীর্ঘদিন পরে, মাঝে মাঝেই গন্ধগুলো আমাদের নাকে এসে লাগে; ফিরিয়ে নিয়ে যায় অতীতে। কোনো কোনো ঘ্রাণে মিশে থাকে প্রিয় কোনো স্মৃতি, ছেলেবেলায় হারিয়ে যাওয়া মুহূর্ত। সুগন্ধের পুরো ব্যাপারই যেন এক অমীমাংসিত রহস্য। তবু যুগের পর যুগ ধরে আরাধনা, প্রাচুর্য জাহির কিংবা অন্যকে প্রলুব্ধ করার মতো নানা কারণে টিকে আছে সুগন্ধির ব্যবহার। সময়ের সঙ্গে তা হয়ে উঠেছে ব্যক্তিচর্চার বিষয়। সাজপোশাক পূর্ণতা পাচ্ছে নিজ পছন্দের পারফিউমে। কোনোটি জোগাচ্ছে আত্মবিশ্বাস, কোনোটি আবার সতেজ করে তুলছে মন। বসন্তকালে প্রকৃতিকে নতুন করে ফিরে পাওয়ার তাড়নায় মন নতুন সৌরভের খোঁজ করে। এ সময়ের সাজপোশাকের ফাল্গুন আমেজে পূর্ণতা দিতে পারে সুগন্ধি। চাই এমন কিছু, যা বয়ে আনে প্রকৃতির সৌরভ। উদ্দীপিত করে মন। প্রকাশ করে আনন্দ ও আশাবাদ।

মডেল: শাকিরা রিয়া
মেকওভার: পারসোনা
ছবি: জিয়া উদ্দীন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top