টেকসহি I ডিকোডিং স্কিন
আরও ব্যক্তিগত হয়ে উঠছে স্কিন কেয়ার কৌশলগুলো। কমছে ট্রেন্ড দেখে ব্যবহারের প্রবণতা। নিজের ত্বকে যা প্রয়োজন, তার ব্যবহার নিশ্চিত করাই লক্ষ্য। সহায়ক হতে পারে ডিএনএ-বেসড স্কিন কেয়ার
প্রাণিদেহের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে জিন। চুল বা চোখের রং, উচ্চতা, ত্বকসহ প্রতিটি বৈশিষ্ট্যের জন্য আলাদা জিন রয়েছে। সেগুলোর বৈশিষ্ট্য বহনকারী অণুর নাম ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড বা ডিএনএ। জন্মের সময় পাওয়া, শরীরের প্রতিটি কোষের ভেতর দুটি পেঁচানো সিঁড়ির মতো অবস্থান করে এটি। নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ করে শরীরের সব গুণ। ত্বকের ধরন-গড়ন, আচরণ থেকে সংবেদনশীলতা—সবকিছুই আসে ডিএনএ থেকে। কার ত্বক কেমন হবে, তা জন্মের আগেই চূড়ান্ত হয়। তাই মানুষের ত্বকের নানা সমস্যার সমাধানের খোঁজ করতে গিয়ে বারবার ডিএনএতে এসে থেমেছেন বিশেষজ্ঞরা। যেন বিন্দু থেকে সিন্ধুর খোঁজ। যেমন করে এসেছে ত্বক, ঠিক তেমন করে ত্বকের সমস্যার সমাধান খোঁজার প্রয়াস।
অবশ্য এখন পর্যন্ত শুধু শুষ্ক, তৈলাক্ত, মিশ্র ও সংবেদনশীল—ত্বককে এই কয়েকটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে সে অনুযায়ী পণ্য তৈরি করে বেশির ভাগ স্কিন কেয়ার ব্র্যান্ড। যুগের পর যুগ ধরে এমনটাই হয়ে আসছে। নিজের ত্বক নিয়ে শুধু অনুমানের ভিত্তিতে পণ্য কিনে ব্যবহার করছেন ক্রেতারা। এই ধারণাকে বাতিল করে দেয় ত্বকচর্চার এই নতুন পদ্ধতি—ডিএনএ-বেসড স্কিন কেয়ার। কাজটি অনেকটা আধুনিক জৈবপ্রযুক্তির ফরেনসিক সায়েন্সের সঙ্গে মিলে। ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করার মতোই ত্বকের সত্যিকার সমস্যা শনাক্ত করা হয়। সে অনুযায়ী দেওয়া হয় সমাধান। ফলে ত্বক ও ত্বকের রোগ নিয়ে অনুমানের আর সুযোগ থাকে না।
তিন ধাপে এটি করা হয়। প্রথমে মুখ থেকে লালা নিয়ে সংগ্রহ করা হয় ডিএনএর নমুনা। এরপর চলে জেনেটিক বিশ্লেষণ। খুঁজে বের করা হয় ত্বকের কোলাজেন উৎপাদনের সক্ষমতা, প্রদাহ প্রতিক্রিয়া, অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের চাহিদা এবং মেলানিনের মাত্রা। তাতে সমস্যাগুলো ধরা পড়ে স্পষ্টভাবে। সবশেষে দেওয়া হয় সমাধান। কারও সঙ্গে কারও ডিএনএ যেমন মেলে না, তেমনই সমস্যা ও সমাধানগুলো হয় আলাদা। কৌশলগুলোও হয়ে থাকে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত; অর্থাৎ, হাইপার-পার্সোনালাইজড।
ত্বকের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে বিশ্বজুড়ে হাজারের বেশি উপকরণ ব্যবহৃত হয়। প্রতিটির ত্বকের চাহিদা ভিন্ন। কিন্তু অন্যের দেখাদেখি নিজের ত্বকে একের পর এক পণ্য ব্যবহার, তারপর আশানুরূপ ফল না পাওয়া তৈরি করতে পারে হতাশা। খরচেও খেতে হয় হিমশিম। সঙ্গে নেট দুনিয়ায় ভাইরাল সব স্কিন কেয়ার কৌশল ফলো করতে গিয়ে ত্বকের বারোটা বাজার ভয়! ত্বক ও ত্বকযত্ন নিয়ে চলে এমন নানা দ্বিধাদ্বন্দ্ব। ডিএনএ-বেসড স্কিন কেয়ার সেগুলোরই ওয়ান-স্টপ সল্যুশন। যার ত্বকে যা প্রয়োজন, সেটির ব্যবহার নিশ্চিত করে; কমায় অপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার খরচ। সহজ ও সংক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে স্কিন কেয়ার রুটিন। এর আরেকটি সুবিধা হলো, পরিবেশে বিউটি ইন্ডাস্ট্রির কার্বন ফুটপ্রিন্ট কিছুটা হলেও কমাতে সাহায্য করে।
‘মূল লক্ষ্য হচ্ছে ত্বককে সহজে ভালো রাখা উপায় খুঁজে বের করা,’ বলেন সুইডেনভিত্তিক স্কিন কেয়ার ব্র্যান্ড অ্যালেলের সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং ত্বক বিশেষজ্ঞ ডা. অ্যান ওয়েটার। ২০২১ সাল থেকে ডিএনএ-বেসড স্কিন কেয়ার নিয়ে কাজ করছেন এই চিকিৎসক। পাবমেড জার্নালে প্রকাশিত বেশ কয়েকটি গবেষণার বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ‘ত্বকের ধরন ও গড়নের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশই আমাদের জেনেটিকসের ওপর নির্ভর করে। অর্থাৎ, ত্বকে বয়সের ছাপ কত তাড়াতাড়ি পড়বে, পিগমেন্টেশন, সংবেদনশীলতা ও ত্বক ঝুলে যাবে কি না, তার জন্য দায়ী ডিএনএতে বিদ্যমান জিন। বাকি ৪০-৫০ শতাংশ নির্ভর করে জীবনযাপন, আবহাওয়ার মতো বিভিন্ন বিষয়ের ওপর।’
‘ধারণাটা এখনো একেবারেই নতুন; তবে প্রচণ্ড সম্ভাবনাময়। কারণ, বিউটি ইন্ডাস্ট্রিতে জেনেটিক সায়েন্সের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে,’ যোগ করেন ডা. ওয়েটার। তাহলে এটিই কি বিউটি ইন্ডাস্ট্রির ভবিষ্যৎ? উত্তর হলো, ‘হ্যাঁ’, তবে সতর্কতাও জরুরি। প্রয়োজন আরও গবেষণা।
বর্তমানে ডিএনএ-বেসড স্কিন কেয়ার নিয়ে কাজ করছে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড। সেগুলোর মধ্যে এগিয়ে আছে এপিজেন-কেয়ার, জেনেটিক বিউটি, ক্যালিজেনিকস, ইমাজিন ল্যাব, এভারগ্রিন লাইফ, দ্য স্কিন ডিএনএ, স্কিনশিফ্ট, ডিএনএ স্কিন ইনস্টিটিউট, আনাকে, আরজিআর প্রভৃতি। ক্রেতাদের ডিএনএ পরীক্ষা করে পণ্য তৈরি করছে ব্র্যান্ডগুলো। সেই যজ্ঞে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় পলি-ডিঅক্সি-রাইবো-নিউক্লিওটাইড বা পিডিআরএন। মানুষের ত্বকে ডিএনএ ঘটিত সমস্যাগুলোর সমাধানে বৈজ্ঞানিকভাবে বেশ কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে এটি। ডিএনএর বিল্ডিং ব্লক হিসেবে কাজ করে। দ্রুত মেরামত করে ত্বকের কোষ। বাড়ায় কোলাজেন। এ ছাড়া ত্বকের গঠন উন্নত করতে, প্রদাহ কমাতে এবং চিকিৎসার পরে পুনরুদ্ধারে সহায়তায় এটি ব্যবহৃত হয়।
স্কিন কেয়ার কৌশলগুলো ক্রমেই আরও স্মার্ট হয়ে উঠছে। ত্বকের যত্নে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে নতুন করে ভাবছে সংশ্লিষ্ট ব্র্যান্ডগুলো। সেখানেই জায়গা করে নিচ্ছে ডিএনএ-বেসড স্কিন কেয়ার রীতি। তবে পরীক্ষা থেকে সমাধান এবং পণ্য ক্রয়—সবটাই বেশ ব্যয়বহুল। স্ট্র্যাটেজি কনসাল্টিং সার্ভিস প্রোভাইডার স্টেলারিক্সের তথ্য বলছে, পরীক্ষা থেকে পণ্য কেনা এবং অন্যান্য ট্রিটমেন্ট বাবদ ছয় মাসে খরচ হতে পারে ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার ডলার। গ্র্যান্ড ভিউ রিসার্চের ধারণা বলছে, আগামী চার বছরের মধ্যে ডিএনএ-বেসড স্কিন কেয়ারের বৈশ্বিক বাজারের মূল্য পৌঁছাতে পারে ১১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে।
বিউটি ডেস্ক
ছবি: সংগ্রহ
