skip to Main Content

কুন্তলকাহন I কেশ ক্লেশ

উষ্ণ হয়ে উঠছে বাতাস। বাড়ছে আর্দ্রতা। বছরের এ সময়ে হঠাৎ বদলে যাওয়া আবহাওয়ার পুরো প্রভাব পড়ে চুলে। উষ্কখুষ্ক অথবা তেলতেলে; নয়তো অনবরত ঝরতে থাকে। বায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চুল সামাল দেওয়া অনেকটাই ঝামেলার। খোঁজা যাক সমাধান

আর্দ্রতা হলো পানির বাষ্পীভূত রূপ। তাপে পানি বাষ্পীভূত হয়। সৃষ্টি করে আর্দ্রতা। যে বাতাসে যত বাষ্প, সে বাতাস ততই আর্দ্র। শীতকালে তাপ কমে গেলে বাতাসের আর্দ্রতাও কমে। বসন্ত এলে তাপের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে আর্দ্রতা। বাতাসে বাড়ন্ত আর্দ্রতা সবার আগে জানান দেয় চুল। বেসামাল হয়ে পড়ে কেশ। দেখা দেয় নানা সমস্যা। তখন তেল থেকে শ্যাম্পুর বোতলে খুঁজতে হয় সমাধান। অথচ একটু বাড়তি সতর্কতাতেই মোকাবিলা করা সম্ভব চুলের এই বিপর্যয়।
চুলের বিপদ
যাকে বলে দা-কুমড়া সম্পর্ক; চুল ও আর্দ্রতার সম্পর্ক ঠিক তেমনই। ফ্রিজি বা উষ্কখুষ্ক চুল হচ্ছে আর্দ্রতাঘটিত সবচেয়ে পরিচিত সমস্যা। কম-বেশি সব বয়সী নারী-পুরুষই ভুগতে পারেন এতে। কারণ, চুল আর্দ্রতা শোষণ করে। জমতে থাকে চুলের কিউটিকলের ভেতর। ক্ষতি করে কেরাটিনের। দুর্বল করে হাইড্রোজেন বন্ড। তখন চুলকে আয়ত্তে রাখা জটিল হয়ে পড়ে। সোজা চুলেও দেখা দেয় হালকা থেকে মাঝারি ঢেউ; আরও কুঁকড়ে যায় কোঁকড়ানো চুল। আর্দ্রতা জমে চুল একসময় ভারী হয়ে ওঠে। ঝরতে শুরু করে পাতলা চুল। চুপসে ফ্ল্যাট দেখায়। শ্যাম্পু করার কয়েক ঘণ্টা পরই দেখা দেয় গ্রিজি বা তেলতেলে ভাব।
গরমে ঘেমে ঘাড়ে লেপ্টে যাওয়া চুলকে বলা হয় স্টিক-টু-দ্য-নেক সিনড্রোম। ফলাফল, প্রাণহীন চুল। অন্যদিকে, ঘন ও ঢেউখেলানো চুল আর্দ্রতা শোষণ করে আরও ফুলে ওঠে। দেখায় এলোমেলো ও পাফি। ব্লো-ড্রাই করে সামলে নেওয়া গেলেও সেটি ক্ষণস্থায়ী। আর্দ্র বাতাসে ১০ মিনিটেই চুল ফিরে যায় আগের অবস্থায়। ঠিকঠাক কাজ হয় না হেয়ার স্প্রে, মুজ বা জেলে। প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে পছন্দসই চুলের স্টাইল।
পোরোসিটির যোগসূত্র
চুলের আর্দ্রতা শোষণ এবং তা আটকে রাখার ক্ষমতাকে বলা হয় হেয়ার পোরোসিটি। এই আর্দ্রতার প্রবেশ ঘটে চুলের বাইরের আবরণ বা কিউটিকল ভেদ করে। এ ছাড়া চুলের আরও দুটি অংশ কর্টেক্স ও মেডুলা। চুলের ধরন, স্থিতিস্থাপকতা ও রং নির্ধারণ করে কর্টেক্স; আর মেডুলা হচ্ছে চুলের ভেতরের নরম স্তর। চুলের গভীরে তেল, পানি, আর্দ্রতা—সবই প্রবেশ করে কিউটিকল দিয়ে।
হেলথলাইন ম্যাগাজিনের তথ্যমতে, চুলের পোরোসিটি তিন ধরনের। কিউটিকলগুলো কাছাকাছি অবস্থান করলে তা লো পোরোসিটি, কিছুটা দূরে অবস্থান করলে মিডিয়াম বা নরমাল এবং দূরত্ব বেশি হলে হাই পোরোসিটি। লো পোরোসিটি চুলে কোনো কিছুই ঠিকমতো প্রবেশ করতে পারে না। আর্দ্রতাও নয়। ফলে চুল রুক্ষ দেখায়। ওদিকে হাই পোরোসিটি চুলে আর্দ্রতা প্রবেশ করে ঠিকই; কিন্তু তা একই পথে বেরিয়েও যায়। তখন প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা ধরে রাখতে না পেরে চুল স্বাভাবিক সৌন্দর্য হারায়।
জেনেটিকস বা বংশগতভাবে নির্ধারিত হয় চুলের পোরোসিটি। তবে সেটিই একমাত্র নির্ধারক নয়। তাপে ব্লো ড্রাইয়িং, স্ট্রেইটনিং, ব্লিচিং, অতিরিক্ত শ্যাম্পু বা কেমিক্যালযুক্ত পণ্য ব্যবহারে কিউটিকল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দেখা দেয় হাই বা লো পোরোসিটি। চুলের জন্য জুতসই নয় কোনোটিই।
চুলের অবস্থা বুঝতে সহজে করতে পারেন পোরোসিটি যাচাই:
 শ্যাম্পু দিয়ে চুল ধুয়ে নিন;
 একটি পানি ভর্তি গ্লাস নিন;
 ভেজা চুল শুকিয়ে গেলে একটি চুল নিয়ে গ্লাসের পানিতে ছেড়ে দিন;
 চুলটির অবস্থান লক্ষ করুন।
ওপরে ভেসে থাকলে তা লো পোরোসিটি। কিছুক্ষণ ভেসে থাকার পর ধীরে ধীরে নিচে পড়লে বা মাঝখানে ভাসতে থাকলে তা মিডিয়াম বা নরমাল পোরোসিটি। সঙ্গে সঙ্গে নিচে পড়ে গেলে তা হাই পোরোসিটি।
পরীক্ষার ঝামেলা না চাইলে চুলে আঙুল বুলিয়ে নিন। চুল মসৃণ মনে হলে বুঝবেন পোরোসিটি কম; রুক্ষ ও এলোমেলো মানে বেশি। আবহাওয়া আর্দ্র হয়ে ওঠার আগেই বুঝে নেওয়া চাই চুলের পোরোসিটি। সে অনুযায়ীই হোক যত্ন।
যত্নে যা কিছু
শ্যাম্পু ও কন্ডিশনার
লো পোরোসিটি চুলে কোনো কিছু সহজে প্রবেশ করতে চায় না। ত্বকের ওপরে জমে থাকে। তাই তুলনামূলক সহজে শোষিত হয় এমন প্রোটিন-ফ্রি শ্যাম্পু বা কন্ডিশনার ব্যবহার করতে পারেন। চুল ভেজা অবস্থায় কন্ডিশনার ভালো কাজ করে। শ্যাম্পু ও কন্ডিশনারে গ্লিসারিন ও মধু থাকলে তা চুলের স্বাভাবিক আর্দ্রতা ফিরিয়ে দিতে পারে। কন্ডিশনার প্রয়োগের সময় স্টিমার, হিট ক্যাপ বা হুডেড ড্রায়ার দিয়ে চুলে হালকা তাপ দিতে পারেন। এগুলো না থাকলে কন্ডিশনার প্রয়োগ শেষে চুলে শাওয়ার ক্যাপ পরা যেতে পারে। হাই পোরোসিটি চুলে আর্দ্রতা ধরে রাখতে বাটার বা তেলসমৃদ্ধ শ্যাম্পু বা কন্ডিশনার বাছাই করা শ্রেয়। ব্যবহার করতে পারেন লিভ-ইন কন্ডিশনার বা হাইড্রেশন সিলার। শ্যাম্পু ও কন্ডিশনার ডিপ ময়শ্চারাইজিং হলে ভালো। কেনার আগে পণ্যের গাঁয়ে ‘অ্যান্টি ফ্রিজ’ লেখা দেখে নেওয়া উত্তম। ঘন ঘন শ্যাম্পু না করে কন্ডিশন করলে রুক্ষতা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
নিয়মিত ট্রিম
রুক্ষ চুলের গোড়ায় ঘন ঘন স্প্লিট এন্ডস দেখা দেয়। বৃদ্ধি বন্ধ হয়। তাই কয়েক মাস পরপর ট্রিম করে নিতে পারেন।
স্টাইল সতর্কতা
সব রকম তাপ এড়িয়ে গেলে রক্ষা পাবে চুল। তাপে ব্লো ড্রাই অথবা চুল স্টাইলিং করার আগে সম্ভাব্য ক্ষতি এড়াতে ব্যবহার করতে পারেন হিট প্রোটেকটিভ হেয়ার স্প্রে বা সেরাম। আর্দ্র আবহাওয়ায় বাইরে যাওয়ার আগে যত কম হেয়ারস্টাইল করা যায়, ততই ভালো।
চুল শুকাতে
মাইক্রো-ফাইবার টাওয়েল ব্যবহার করতে পারেন। এতে চুলের কিউটিকলগুলো সুরক্ষিত থাকবে।
ট্রিটমেন্ট
চুলের ফ্রিজি ভাব দূর করতে সহায়ক হতে পারে কেরাটিন ট্রিটমেন্ট। প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা চুলের ভেতর আটকে চুলকে ঝলমলে করে তুলতে পারে এটি।
ডিট্যাংগ্লার
চুল ধোয়ার পর ভেজা চুলের জট ছাড়িয়ে নিলে অনেকটা আরাম পাওয়া যায়। সেরাম, ক্রিম, মুজ নানা রূপে ডিট্যাংগ্লার পাওয়া যায়। ভেজা চুলে লাগিয়ে আঁচড়ে ছাড়িয়ে নিতে পারেন জট।
ঠিকঠাক যত্নে আর্দ্রতাও হয়ে উঠতে পারে চুলের বন্ধু। নিষ্প্রাণ রুক্ষ চুলে ফেরাতে পারে প্রাণ। শুধু আগেভাগে বুঝে নেওয়া চাই চুলের ভাব। সঙ্গে যত্নের উপায়গুলো যোগ-বিয়োগ করে নিলেই হলো।

 আবৃতি আহমেদ
মডেল: ইনাবা
মেকওভার: পারসোনা
ছবি: জিয়া উদ্দীন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top