skip to Main Content

ত্বকতত্ত্ব I মালঞ্চ মালিকা

ফুলপরীর জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় কসমেটিক ইন্ডাস্ট্রির কলেবর বেড়েছে কয়েক গুণ। টেকসই তত্ত্বের প্রভাব আর প্রকৃতিপ্রেম—এ দুয়ের সন্ধিতে বিকশিত প্রোডাক্ট লাইন

ফুলের আছে নিজস্ব কালার প্যালেট। প্রকৃতির নিয়মে তৈরি হয় রং। লাল হবে, নাকি নীল—সবটাই ঠিক করে দেয় ফুলের রঞ্জক। রংবেরঙের পাপড়িতে সাধারণত চার ধরনের রঞ্জক মেলে—লাল, গোলাপি, নীল ও বেগুনি। এসব রঙের ফুলে থাকে পানিতে দ্রবণীয় প্রাকৃতিক রঞ্জক পদার্থ। হলুদ ও কমলা ফুলে ক্যারোটিনয়েড; হালকা ধূসর বা কালচে ফুলে বেটালেইনস। এই চারের কাজ শুধু রং তৈরি নয়; শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্টও উৎপন্ন করা।
আদি থেকে এখন
মানবসভ্যতার শুরু থেকে ত্বকযত্নে ব্যবহৃত হয় প্রাকৃতিক নানা নির্যাস। খ্রিস্টপূর্ব ৩ হাজার অব্দে প্রাচীন মিসরে পদ্ম, গোলাপ, সূর্যমুখী ইত্যাদি ফুল দিয়ে তৈরি হতো তেল, মলম ও প্রসাধনী। ফুল দিয়ে রূপচর্চা করত মিসরীয়রা। তাদের বিশ্বাস ছিল, ফুলের রং ত্বককে রোদ ও শুষ্কতা থেকে রক্ষা করতে পারে। প্রাচীন চীনে চন্দ্রমুখী, পিওনি ও বরই ফুলের পাপড়ি দিয়ে তৈরি হতো ব্যথানাশক বাম ও হারবাল ক্রিম। ত্বকের ক্ষত সারাতে এবং লালচে ভাব দূর করতে ফুলের নির্যাস ব্যবহার করত গ্রিক ও রোমানরা। মধ্যযুগীয় ইউরোপে বৌদ্ধধর্মের প্রার্থনালয়ে ভেষজ ওষুধের পাশাপাশি ত্বক পরিচর্যার জন্য ফুল চাষ হতো। ত্বকে সংক্রমণ ও প্রদাহের চিকিৎসা করা হতো ক্যালেন্ডুলা ও ক্যামোমাইল ফুল দিয়ে। উনিশ শতকে পশ্চিমা মহলে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ফুলভিত্তিক প্রসাধনী। ত্বক পরিষ্কার ও টোনিং করতে গোলাপজল ও ফুলের তেল ব্যবহৃত হতো। আর ভারতীয় উপমহাদেশে রয়েছে আয়ুর্বেদ চর্চা। হাজার বছরের পুরোনো এই প্রাচীন প্রথায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে রংবেরঙের ফুল।
মূল মন্ত্র
ত্বক ও ফুল; যেন শর্তহীন এক জুটি। ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের পাবমেড জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণা অনুযায়ী, ত্বকযত্নে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় কাজ করে ফুলের রঞ্জক। সার্বিয়ার একদল ত্বক বিশেষজ্ঞের করা এ গবেষণায় পাওয়া যায়, ফুলের রঞ্জক সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি বিকিরণ করে। ত্বকে রক্তসঞ্চালন বাড়িয়ে বয়সের ছাপ কমায়। ফুলের নির্যাস ত্বকে প্রদাহ সৃষ্টিকারী কিছু রাসায়নিক উপাদানের শক্তি কমিয়ে দেয়। এতে ত্বক শান্ত হয়; ব্রণ, লালচে ভাব, চুলকানি ও ডার্মাটাইটিসের মতো সমস্যা কমে যায়। ত্বকের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান কোলাজেন ও ইলাস্টিনের ভাঙন রোধ করে নতুন কোলাজেন তৈরি করতে পারে। ফুলের রঞ্জক সানস্ক্রিনের ক্ষমতা বাড়ায়। কিছু ফুলের নির্যাস ত্বকে মেলানিন সৃষ্টিকারী টাইরোসিনেজ নামক এনজাইমের সক্রিয়তা কমায়। ফলে ত্বক উজ্জ্বল দেখায়।
২০২২ সালে পাবমেডে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রসাধনীতে ফুলের রঞ্জক জৈব সক্রিয় রং হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। গবেষণাকালে পোল্যান্ডের একদল ত্বক বিশেষজ্ঞ পাঁচটি রঙিন ফুল পরীক্ষা করে দেখেন, সেগুলোর নির্যাস সম্পূর্ণ নির্বিষ। অর্থাৎ, প্রসাধনীতে মানবসৃষ্ট কেমিক্যাল, রং যতটা ক্ষতিকর; ফুলের রং ততটাই নিরাপদ।
পাওয়ারহাউস
স্কিন কেয়ারে জুড়ছে একের পর এক নতুন পালক। বাড়ছে কেমিক্যালযুক্ত পণ্যের ব্যবহার। তবু পিছিয়ে পড়েনি প্রকৃতি। হাজারো পণ্যের ভিড়ে প্রকৃতির কিছু ফুলই হয়ে উঠেছে ত্বকচর্চার পাওয়ারহাউস।
ক্যালেন্ডুলা
কমলা রঙের ছোট্ট একটি ফুল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ত্বকে এ ফুলের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিরাপদ। ক্যালেন্ডুলায় রয়েছে ওলিয়ানোলিক অ্যাসিড, লুপিওল ও কোয়ারসেটিন। এগুলো ত্বকের প্রদাহ ও শুষ্কতা দূর করতে পারে। এ ফুল সংবেদনশীল ত্বকের জন্য বেশ উপকারী।
ল্যাভেন্ডার
এ ফুল থেকে তৈরি তেলের অনেক গুণ। ত্বকের প্রদাহ কমায় এর নির্যাস। দূর করতে পারে শুষ্কতা ও চুলকানি। ধরে রাখে ত্বকের আর্দ্রতা। ফুলটির জীবাণুবিরোধী বৈশিষ্ট্য ব্রণ নিরাময়ে সক্ষম। ত্বরান্বিত করে কোষের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া।
জবা
ত্বকের বয়স কমিয়ে দিতে এ ফুলের বেশ সুনাম! তাই একে বলে ন্যাচার’স বোটক্স। জবা ফুলে বিদ্যমান আলফা হাইড্রোক্সি অ্যাসিড (এএইচএ) ত্বকের মৃতকোষ দূর করে। এর ভিটামিন সি কালো দাগ দূরীকরণে সহায়ক। নিয়ন্ত্রণে রাখে ত্বকের তৈলাক্ততা। কোলাজেন বাড়ায় এবং ত্বককে আরও দৃঢ় ও কোমল করে তুলতে সক্ষম।
গোলাপ
গোলাপ আর ত্বক—অবিচ্ছেদ্য এক জুটি। ত্বক পরিষ্কার করে গোলাপজল। ত্বকে আর্দ্রতা ধরে রাখে; লালচে ভাব কমিয়ে ত্বক রাখে শান্ত। ধরে রাখে স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা। ক্যামোমাইল প্রদাহবিরোধী। ত্বকের একজিমা, সোরিয়াসিস ও রোসেসিয়ার মতো রোগের ওষুধে এ ফুল কাজ করে। দূর করে রোদে পোড়া ভাব।
সূর্যমুখী
ফুলটি ত্বকের শুষ্কতা রোধ করতে পারে। এটি ভিটামিন ই-এর অন্যতম উৎস। নন-কমেডোজেনিক হওয়ায় লোমকূপ বন্ধ করে না। এ ফুলের ফ্যাটি অ্যাসিড ত্বকের উপরিভাগকে মসৃণ করে।
পদ্ম
পদ্ম ফুল প্রাকৃতিক ময়শ্চারাইজার। দৃঢ় করে তুলতে পারে ত্বকের টেক্সচার বা গঠন। সব ধরনের ত্বকে ব্যবহার উপযোগী।
সচেতন ক্রেতাগণ
ল্যাবে তৈরি বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিকের যুগে, সচেতন মানুষ খোঁজে সেই চিরচেনা প্রকৃতিকেই। ত্বকের জন্যও ব্যতিক্রম নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাই বারবার উঠে আসে ক্লিন বিউটি, সাসটেইনেবল বিউটির মতো পরিবেশসচেতন আলোচনা। কথা হয় প্যারাবেন, সালফেট, ফ্যাথলেট, কৃত্রিম সুগন্ধি ও ফরমালডিহাইডের বিরুদ্ধে। ভয় হয় কৃত্রিম রসায়নের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে। ক্রেতাদের ভয় দূর করতে তাই পণ্যে ব্যবহৃত উপাদানের স্বচ্ছতা প্রকাশে বাধ্য হচ্ছে ব্র্যান্ডগুলো। প্রাণিজ উপকরণ ব্যবহার না করা এবং ক্রুয়েলটি ফ্রি পণ্যে বেশি স্বচ্ছন্দবোধ করছেন ক্রেতারা। দাবি তুলছেন পণ্যের পরিবেশগত টেকসই চর্চার। ত্বকের জন্য প্রকৃতির দান গ্রহণে পিছিয়ে নেই বাংলাদেশও। এ দেশের সাবান থেকে তেলে ফুল আর ফুলেল সৌরভ এক পুরোনো দাবিদার। ফুল দিয়ে নিত্যনতুন ক্রিম, স্ক্রাব, বডিওয়াশ, ফেসপ্যাক ইত্যাদি তৈরি করছে দেশের স্কিন কেয়ার ব্র্যান্ডগুলো। বিদেশি পণ্যের ভিড়ে অনেকটাই সহজলভ্য আর পরিবেশভিত্তিক রূপচর্চা দূর করে সংশয়। সঙ্গে নির্মল হয়ে ওঠে ত্বক ও ত্বকের পরিচর্যা।
 আবৃতি আহমেদ
মডেল: মম
মেকওভার: পারসোনা
ছবি: জিয়া উদ্দীন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top