skip to Main Content

ছুটিরঘণ্টা I ফুলে ফুলে রোড আইল্যান্ড

যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ছোট্ট প্রদেশের রাজধানীজুড়ে বসন্তের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য। হাওয়ায় হাওয়ায় বসন্তের সুবাস। নিকটবর্তী সমুদ্রসৈকতের রূপ দেখেও চোখ ফেরানো দায়! ঘুরে এসে লিখেছেন ফাতিমা জাহান

ট্রেনের নাম এমট্র্যাক। আমেরিকার বোস্টন শহর থেকে রওনা দিয়েছে। অবশ্য ঝমঝম করে চলার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ট্রেন, অতি উন্নত ও আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে তৈরি; তাই চাইলেই বাংলার অতি প্রাচীন ট্রেনের ঝমঝম সুর শোনার উপায় নেই। আমি আর আমার ভাই নাঈম যাচ্ছি আমেরিকার সবচেয়ে ছোট প্রদেশ রোড আইল্যান্ডে।
ট্রেনের প্রসারিত জানালা দিয়ে অবিরাম সবুজ বনভূমি সরে সরে যাচ্ছে। এই অঞ্চলে বসন্তকাল শুরু হয়েছে। গাছপালা সব হরিয়ালি ছড়াচ্ছে। ট্রেনের জানালা দিয়ে আপাতত সবুজ বনানী ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। আধুনিক বোস্টন শহর ছাড়িয়ে ট্রেন চলছে যেন আদি অষ্টাদশ শতাব্দীর বনভূমির ভেতর দিয়ে। অবশ্য রেলগাড়ির এই যাত্রা লম্বা ছিল না। মাত্র এক ঘণ্টায় আমরা পৌঁছে গেলাম রোড আইল্যান্ডের রাজধানী প্রভিডেন্স শহরে।
রেলস্টেশন থেকে বের হয়ে আমার বিস্ময় যেন কাটে না। অবশ্য যেকোনো নতুন শহর বা গ্রামে বেড়াতে গেলে আমি বারবার বিস্মিত হই। সাধারণত সব জায়গায় একা ভ্রমণ করলেও এবার বোস্টনে এসেছি ভাই-বোনের সঙ্গে। চোখের সামনে পুরোনো আমলের সব সরকারি ভবন দাঁড়িয়ে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্টেট হাউস ভবনটি। দেখতে ওয়াশিংটন ডিসির হোয়াইট হাউস ভবনের মতো। সাদা রঙের লম্বা একটি ভবন, যার মাথায় গোলাকার ডোম বা গম্বুজ। এটি নাকি পাথরে তৈরি বিশ্বের চতুর্থ বৃহৎ গম্বুজ। এই ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল ১৮৯১ সালের দিকে। তখন থেকে সরকারি কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বর্তমানে রোড আইল্যান্ডের সংসদ ভবন ও গভর্নরের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
স্টেট হাউস ভবনের আশপাশে প্রচুর গাছপালা, সামনে সবুজ ঘাসের লন। স্টেট হাউসের সামনে কারা যেন সবে অনুষ্ঠান শেষ করল। ছোট কোনো সংগঠন হবে। এখন সবাই গাছের নিচে দাঁড়িয়ে কফি খাচ্ছেন আর আলাপ করছেন। আমরা স্টেট হাউসের সামনে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করলাম। আজ ছুটির দিন বলে অফিস বন্ধ; তাই ভেতরে যাওয়া হলো না। তবে রাস্তা পার হলেই সামনে একটি নদী শহরের মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে। নদীর জলের রং সবুজ; নাম প্রভিডেন্স রিভার। আশপাশে কয়েকটি সুউচ্চ ভবন আছে; তবে বেশ দূরে দূরে। নদীর একদিকে দেখি, কয়েকজন কায়াকিংয়ের নৌকা নিয়ে কায়াকিং করছেন। সকালের আমেজ শেষ হয়ে গেছে। এখন রোদ চড়ছে। বসন্তকাল। গান গেয়ে যাচ্ছে প্রকৃতি। নদীর পাশ দিয়ে অনেক গাছপালা ছায়া দিচ্ছে। শহরে যেদিকে চোখ পড়ছে, সেদিকেই গাছপালার প্রাচুর্য।
অফিসপাড়া পেরিয়ে আরেকটু সামনে গিয়ে মাঝারি আকারের একটি পার্কের দেখা মিলল। পার্কে প্রবেশের আগেই গোলাপের সুগন্ধে বাতাস ধাক্কা দিয়ে গেল কয়েকবার। আমি সুগন্ধের পেছনে পেছনে দৌড়ে যাই। ঠিকই ধরেছি, সুগন্ধ আসছিল পার্কের ভেতরে ফুটে থাকা হাজার হাজার গোলাপ ফুল থেকে। একে তো চারপাশ গাছপালায় ঘেরা, তার ওপর পার্কের পুরোটাই শুধু লাল, গোলাপি গোলাপে রঙিন হয়ে আছে। এত শৌখিন কে—নগরপ্রধান, না তার অধস্তন কেউ, খুব জানতে ইচ্ছা করছে। আমি এই গোলাপের মাঝে হারিয়েই গিয়েছিলাম; কিন্তু ভাইয়ের ডাকে সংবিৎ ফিরে পেতে হলো। ব্রাউন ইউনিভার্সিটি খুঁজে পেয়েছে সে, কাছেই। আমরা দুজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। আমি গবেষণা করি আর ভাই স্নাতকে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে আমাদের আগ্রহের শেষ নেই। আর আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এত হৃদয়গ্রাহী যে, এগুলোর ক্যাম্পাসে কিছুক্ষণ ঘুরে এলেও মন ভালো হয়ে যায়।
ব্রাউন ইউনিভার্সিটির নাম ছিল রোড আইল্যান্ড কলেজ। ১৭৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। বিরাট ক্যাম্পাস। বিশাল বিশাল সবুজ লনের সামনে মূল ভবনটি ইউরোপীয় ধাঁচের লাল ইটের তৈরি। ভবনের মাঝখানে দোচালা ঘরের মতো চৌকো করে ছাদ বসানো। মূল ভবনের দুপাশে আরও কিছু ভবন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। সেই ভবনগুলোও অনুচ্চ, ছিমছাম, ছোট ছোট। আজ ছুটির দিন বলে আশপাশে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। ভবনগুলোর পাশে আর পেছনে বড় বড় গাছ। বাতাসে গাছের পাতায় সরসর আওয়াজ অবিরাম। আজ সবার ছুটি; শুধু পাতাদের ছুটি নেই! শীতকালে এই পাতাগুলো ছুটিতে চলে যায়। তখন ন্যাড়া মাথায় দাঁড়িয়ে থাকে গাছগুলো। এই সুন্দর, শান্ত, সবুজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনা আর সেই আঠারো শতকে নির্মাণ করা মূল ভবন দেখে রোড আইল্যান্ড প্রদেশ কীভাবে আমেরিকার মানচিত্রে জায়গা করে নিল, সেই মজার গল্প মনে পড়ল।
১৬৩৬ সালে রজার উইলিয়ামস নামের একজন ভদ্রলোককে ম্যাসাচুসেটস থেকে বের করে দেওয়া হয়। অভিযোগ গুরুতর, তিনি নাকি সংবিধান থেকে ধর্মকে আলাদা করতে চেয়েছিলেন। সে সময়কার কট্টর সমাজব্যবস্থা তার এই উদার চিন্তা মানতে পারেনি। ম্যাসাচুসেটস থেকে রজার একপ্রকার পালিয়ে চলে আসেন ছায়াঘেরা, পাখি ডাকা, শান্ত এক জনপদে। সে জনপদের এক পাশ দিয়ে বয়ে যায় নীল সাগর। সেখানে নেটিভ আমেরিকানদের কাছ থেকে কিছু জায়গা কিনে বসবাস করতে থাকেন। নিজের বুদ্ধিতে নানা উন্নয়নমূলক কাজ চালিয়ে যান এবং একটি সেক্যুলার সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলেন। তার দেখাদেখি তদানীন্তন বিদ্রোহীরাও দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে এসে জুটতে থাকেন। মুক্তচিন্তার বিকাশ ঘটে এই এলাকায়। আমেরিকা রেভল্যুশনের পর প্রদেশটি পুরোপুরি স্বীকৃতি পায়। আদতে এটি ছিল একটি ব্রিটিশ কলোনি। মানে গ্রেট ব্রিটেন থেকে আসা অধিবাসীদের আবাসস্থল। আমেরিকায় ব্রিটিশদের এ রকম ১৩টি কলোনি ছিল। পরে রাজধানীর নাম দেওয়া হয় প্রভিডেন্স। সেই শহরে আমি দাঁড়িয়ে এখন। রজার উইলিয়ামস ঘূণাক্ষরেও জানতেন না, এটি একসময় আমেরিকার সবচেয়ে শান্ত, সুন্দর প্রদেশ হবে। যে প্রদেশের জনসংখ্যা এখন মাত্র ১১ লাখ।
রাস্তা দিয়ে আরেকটু এগোলে এ শহরের সবচেয়ে পুরোনো গির্জা। খুব মজার শহর তো, হেঁটে হেঁটে অনেকখানি ঘুরে দেখা যাবে। আরও মজা লাগল এই ভেবে, রজার উইলিয়ামস এই প্রদেশে চলে এসেছিলেন সেক্যুলার ধারার প্রচার করতে। গির্জাটি নির্মিত হয়েছিল তার জীবদ্দশায়। আর গির্জাটিও তখন সেক্যুলার মনোভাবেরই ছিল, মানে অ্যাংলিকান চার্চ। পরে কালে কালে প্রটেস্ট্যান্ট মতাবলম্বীরা এসে এখন সেই মতধারায় গির্জা চালান। গির্জার নাম ট্রিনিটি চার্চ; নির্মাণকাল ১৬৯৮ খ্রিস্টাব্দ।
সাদা, সৌম্য গির্জা আর দোচালা ঘরের মতো চৌকো কংক্রিটের ছাদ; সামনে লম্বা খাড়া স্টিপেল বা মিনারের মতো স্তম্ভ। এই গির্জায় নিয়মিত প্রার্থনা ও অন্যান্য কার্যক্রম চলে। গির্জার চারদিকে গাছপালায় ছেয়ে আছে। এখন দুপুরবেলা, গির্জার দরজা বন্ধ; তাই ভেতরে গিয়ে দেখা হলো না। আমি আর নাঈম আরেকটু এগিয়ে গুপ্তধন পাওয়ার মতো পেয়ে গেলাম বেনিফিট স্ট্রিট, যা আমরা খুঁজছিলাম। ঐতিহাসিক স্থানে ঘুরে বেড়াতে আমার মতো আমার ভাইও খুব পছন্দ করে। বেনিফিট স্ট্রিট পাড়ায় আদতে রোড আইল্যান্ডের সব পুরোনো বাড়িঘর আছে; মানে যখন রজার উইলিয়ামস এসে এখানে বসতি গড়েছিলেন, সে সময়কার।
পাড়ার প্রথমেই এমন এক বাড়ি পড়ল, দেখে চোখ ফেরাতে পারছিলাম না। স্বপ্নের বাড়ি বোধ হয় এমনই হয়! লালচে গোলাপি রঙের একতলা বাড়িটির মালিক ছিলেন ক্যাপ্টেন আলোন্সো। ১৭৭৫ সালে এটি নির্মাণ করা হয়; বাড়ির সামনের ফলকে তা-ই লেখা আছে। ধূসর দোচালা ছাদ আর লালচে দেয়ালের ঠিক মাঝখানে বাড়ির চিমনি দাঁড়িয়ে। সামনের দিকে দুটো জানালা আর জানালায় বাহারি ফুলের গাছ। জানালার নিচের দিকে আমেরিকার পতাকা ঝুলছে। বাড়ির আরেক কোনায় আমেরিকার আরেকটি পতাকা। পুরো পাড়া হেরিটেজ সাইটের অন্তর্ভুক্ত; তাই সব বাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সরকারের। বাড়ির সামনে ও পেছনে উঁচু উঁচু কয়েকটি গাছ বাতাসে দোল খাচ্ছে। এ শহরে সবুজের অভাব নেই। যদি কিছুর অভাব থাকে, তা হলো মানুষ! এই যে এতক্ষণ ধরে ঘুরছি, স্টেট হাউস ছাড়া অন্য কোথাও বা ফুটপাতে কারও চলাচল করতে দেখলাম না।
ক্যাপ্টেন আলোন্সোর বাড়ির বাগানটি দেখার মতো। এই বাগান আসলে বাড়ির সামনে নয়; বরং পাশে ও পেছনে বিস্তৃত। বাড়ির পাশে বড় একটি বার্চ গাছ ছায়া দিচ্ছে। গাছের নিচে একটি কার্টে বেশ কিছু মৌসুমি ফুল গাছ লাগানো। বাগানের মাটিতে তো ছোট ছোট গুচ্ছ গুচ্ছ ফুল গাছ আছেই, এর পাশে সারিবদ্ধভাবে টবেও ফুল গাছ। টবের সব গাছে ফুল ধরেছে। এত সবুজ আর ফুলের মাঝে একটি পাখির খাঁচা রাখা। স্বপ্নের দৃশ্যকে পূর্ণতা দিয়েছে যেন। দেখে মনে হচ্ছে, এ এক রূপকথার দেশ।
আলোন্সো সাহেবের বাড়ির পেছনের দিকে যাওয়ার পথটি নিচু। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামলেই বাঁ পাশে বাগান। এটি সামনের বাগানের চেয়েও চমৎকার। সারা বাগানে গুচ্ছ গুচ্ছ লাল, হলুদ, গোলাপি, কমলা, বেগুনি ফুল আলাদা আলাদা গোছায় ফুটে আছে। ভায়োলেট, জেরোনিয়াম, ওয়াক্স বেগোনিয়া, বাটন ফ্লাওয়ার, পেন্সি, হাইড্রেঞ্জিয়া, সাইক্ল্যামেন…আরও কত ফুল যে ফুটেছে আলোন্সো সাহেবের বাড়িতে।
এ পাড়ায় একেকটি বাড়ি সপ্তদশ বা অষ্টাদশ শতাব্দীতে যেভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল, সেভাবেই রাখা আছে। দেখে মনে হচ্ছে বাসিন্দারা ভেতরেই আছেন, দরজার কড়া নাড়লে এসে দরজা খুলে জিজ্ঞেস করবেন—‘কী চাই?’ তবে এখন বাড়ির ভেতরে কারও যাওয়ার অনুমতি নেই। বাইরে থেকেই দেখতে হবে।
একেকটি বাড়ি বেশ দূরে দূরে। কয়েকটি বাড়ি পেরিয়ে সামনে আরেকটি চমৎকার বাড়ি পড়ল, ব্রাউন পরিবারের। ১৭৭৪ সালে নির্মিত। ব্রাউন সাহেব ছিলেন বিজ্ঞানী ও স্থপতি। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির নামকরণ তার নামেই। বাড়িটি অন্যান্য বাড়ির চেয়ে বড় এবং নকশাও ভিন্ন। দরজা ও জানালার উপরিভাগ গোলাকার। লাল ইটের তৈরি বাড়িটি যে ২৫২ বছর ধরে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে, সেটাই এক বিস্ময়। এ শহরে বাড়িঘরের চেয়ে গাছপালা বেশি। ফুটপাতে কেউ নেই; তাই হেঁটে, দৌড়ে—যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে দেখা যাচ্ছে একেকটি পুরোনো বাড়ি।
বেনিফিট স্ট্রিট নিয়ে কিছু গা ছমছম করা গল্প প্রচলিত আছে। সন্ধ্যা নামার পরপর যখন ধীরে ধীরে দিনের আলো নিভে যেতে থাকে, তখন নাকি কেউ একজন ঘোড়ায় চড়ে এই এলাকা টহল দেয়! আর সেই টহল রাতভর চলতে থাকে। সারা রাত ঘোড়ার খুরের আওয়াজ শোনা যায়। এ রকমও বলা হয়, মাঝরাতে একটি মেয়ে নাকি সাদা গাউন পরে পথে পথে ঘোরে। আমি ভাইকে বললাম, ‘এদের পথে পথে ঘোরার কী দরকার; এত খালি বাড়ি পড়ে আছে, এর কয়েকটার দখল নিলেই তো হয়!’
ভাই আমার কথা শুনে হাসে। আমরা আজ রাতে আবার বোস্টন ফিরে যাচ্ছি; না হলে ভূতগুলোর সঙ্গে দেখা করে যেতাম! ভূতের দেখা না পেলেও এমন ঐতিহাসিক পাড়ায় যদি কেউ সত্যিই ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে বেড়াত, তাহলে এই শূন্য পথঘাট প্রাণ পেত।
বেনিফিট স্ট্রিট অনেক দূর অবধি চলে গেছে। একটি লম্বা পথ যেন পাশের আধুনিক পাড়া থেকে হঠাৎ আলাদা হয়ে ছিটকে আঠারো শতকে গিয়ে থেমে রয়েছে।
রোড আইল্যান্ডে আমার এক বন্ধু থাকে, দুপুরের পরে তার সঙ্গে দেখা করার কথা। আমরা তাই আরেকটু ঘুরে একটি আধুনিক পাড়ার পথে ঢুকে পড়লাম। প্রভিডেন্সকে কোনোভাবেই কেতাদুরস্ত আমেরিকান শহর বলে মনে হয় না। দেখে মনে হয় শান্ত, ধীরে বয়ে চলা এক মফস্বল শহর। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির কাছে দু-একটা বহুতল ভবন (তা-ও আবার সর্বোচ্চ ৮-১০ তলা) দেখেছি; কিন্তু এ ছাড়া আর কোথাও কোনো সুউচ্চ ভবন নেই। সবই দোতলা অথবা একতলা। এ রকম ছিমছাম শহরকে তো মফস্বল বলাই চলে।
আমরা এক শান্ত সড়কে পাশাপাশি কয়েকটি রেস্তোরাঁ দেখে একটিতে ঢুকে পড়লাম। রেস্তোরাঁগুলোতে ভিড় নেই; আর সজ্জা দেখে মনে হলো, এখানেই বসে থাকি। কারণ, সামনে প্রভিডেন্স নদী বয়ে চলছে, নিচু ভলিউমে জ্যাজ সংগীত বাজছে; রেস্তোরাঁর সামনে পাতা টেবিল চেয়ারে যতক্ষণ খুশি বসে থাকা যায়। সামনে শুধু নদীই নেই; তার আশপাশে এত গাছপালা, এই এলাকাকে ছোটখাটো একটি বনভূমিও বলা যায়। আর আছে ফুলের বাগান। এ শহরকে ফুলের শহর বললে ভুল হবে না! এদের ফুলগাছ লাগানো আর তার যত্ন নেওয়ার খুব শখ, তা দেখেই বোঝা যাচ্ছে।
আমেরিকান খাবার বলতে পিৎজা, বার্গার বা হটডগ—এসবই। এই দিয়েই আমাদের দিন চলছে। দুপুরের খাবার খেয়ে আমরা আবার পথে নামলাম প্রভিডেন্স শহরের আধুনিক পাড়া ঘুরে দেখব বলে। এই পাড়ার বাড়িগুলো অনেকটা আগের পাড়ার মতোই। প্রায় প্রতিটি বাড়িই ডুপ্লেক্স আর একটি বাড়ি থেকে আরেকটি বেশ দূরে দূরে দাঁড়িয়ে। কোনো বাড়ির দেয়াল নেই। পর পর সাজানো ছবির মতো বাড়িগুলো যেন একটি শহরের রুচিশীলতার কথা বলে যাচ্ছে। একেকটি বাড়ির সামনে সাজানো বাগানে গুচ্ছ গুচ্ছ নানা জাতের ফুল ফুটে আছে। কোনো কোনো বাড়ির দোতলা সমান বড় বড় গাছ ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে। কোথাও এমনিতেই রোড ডিভাইডারজুড়ে ল্যাভেন্ডার, হাইড্রেঞ্জা, জেরানিয়াম, সাইক্ল্যামেন, জাইগো ফুল ফুটে আছে। এদের যত্নও নিশ্চয় নেওয়া হয়। কিছু কিছু বাড়িতে কাঠের সুদৃশ্য বেড়া দেওয়া। সেই বেড়া বেয়ে লতিয়ে উঠছে বেগুনি ক্লেমেটিস বা লাল সুইট পিস। বাড়িগুলো দেখে মনে হচ্ছে, স্বপ্নের রাজ্যে চলে এসেছি। এত সুন্দর কোনো পাড়া হতে পারে! আমি বাগান আর নানা রঙের ফুল দেখতে দেখতে একজনের বাগানে প্রায় ঢুকেই যাচ্ছিলাম। ভাই ধরে না আনলে এতক্ষণে ট্রেসপাস করার অপরাধে নিশ্চয় পুলিশ এসে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যেত। ভাই কয়েক বছর ধরে এ দেশে পড়াশোনা করছে, তাই নিয়মকানুন জানে। আমি তো এত কিছু জানি না। তবে অনুমতি ছাড়া কারও আঙিনায় বা টেরিটোরিতে ঘোরাঘুরি করা যে অপরাধ, তা জানা ও মানা ভালো অভ্যাসের মধ্যে পড়ে।
এতক্ষণ এই পাড়ায় ঘুরলাম, এখানেও কোনো মানুষ চোখে পড়ল না। আশ্চর্য তো, এ শহরে কি মানুষ থাকে না! শুধুই ফুলবাগান আর গাছপালার আবাস!
আমরা ফুলের বাগান দেখতে দেখতে আমার বন্ধু এনা আর স্টিভ চলে এলো। আমি প্রভিডেন্স শহরে আসব বলে ওরা কিছু সময় বের করেছে দেখা করার জন্য। ওদের গাড়িতে করে আমাদের এবার নিয়ে যাবে শহরের আরেক প্রান্তে, যেখানে সমুদ্রসৈকত আছে।
গাড়ি ছুটছে আর আমি মুগ্ধ নয়নে প্রভিডেন্সের রূপ দেখছি। পুরো শহর যেন উঁচু উঁচু গাছপালা আর জলাধারে সাজানো। মূল শহর থেকে বের হলে যেখানে নদী সাগরে মিলেছে, সেখানে সারি সারি সাদা সেইলিং বোট ঘুরে বেড়াচ্ছে। এগুলো প্রাইভেট বোট; অনেকে শখের বশে এ রকম সেইলিং করেন। নীল নদীর জলে সাদা বোটগুলো দেখতে একেকটি রাজহাঁসের মতো লাগছে।
গাছপালার রাজ্য পার হয়ে অবশেষে আমরা জেমসটাউন সমুদ্রসৈকতে এসে পৌঁছলাম। দূর থেকে সমুদ্রের নীল জল হাতছানি দিচ্ছে। ভয়ানক নীল রঙের হাতছানি উপেক্ষা করা অসম্ভব। আমরা গাড়ি থেকে নেমে পাথরের উঁচু উঁচু টিলায় লাফিয়ে, ডিঙিয়ে নীল জলের একদম কাছাকাছি চলে এলাম। এই সৈকতের উঁচু পাথরের নিচে সমতল বালির সৈকত নেই। আছে শুধু খাড়া খাড়া পাথরের টিলা। আমি জলের কাছাকাছি একটি পাথরে বসলাম। সমুদ্রের হাওয়া অসম্ভব ঠান্ডা। হাড়ে একেবারে হিম ধরিয়ে দেয়। আর পাহাড় সমান উঁচু উঁচু ঢেউ এসে আশপাশের সবকিছু ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। সেই ঢেউ থেকে আমিও রেহাই পেলাম না। এক ঝটকায় ভিজিয়ে দিয়ে গেল।
বিকেলের আলো তির্যকভাবে এখন গায়ে এসে পড়ছে। এই আলো, এই নীল সমুদ্র, এই অসামান্য সুন্দর প্রভিডেন্স শহর আমাকে মনে রাখবে কি না জানি না; আমি এদের সবাইকে মনে রাখব। কারণ, রোড আইল্যান্ড রাজ্য, প্রভিডেন্স শহর আমেরিকায় আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দর দর্শনীয় স্থান হয়ে মনে রয়ে যাবে।

ছবি: লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top