skip to Main Content

ফরহিম I নিদ্রা নিদান

প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে জীবনযাত্রার গতি বেড়েছে বহুগুণ। তাতে উবে যাচ্ছে প্রশান্তির ঘুম আর মানসিক স্বস্তি। যার নেতিবাচক প্রভাব মস্তিষ্কের পাশাপাশি পড়ে ত্বকেও। বিশেষ করে পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রকটভাবে ধরা দেয়। বিস্তারিত ফাহমিদা শিকদারের লেখায়

অফিসের দীর্ঘ কর্মঘণ্টা বা নিয়মিত রাত জাগা শুধু শরীরকে ক্লান্ত করে না; চেহারার স্বাভাবিক লাবণ্য কেড়ে নিয়ে বয়সের ছাপ ফেলে অকালে। মনে জমে থাকা অস্থিরতা ও অনিদ্রা নিঃশব্দে ত্বকের বারোটা বাজিয়ে দেয়। পুরুষদের ত্বকের রুক্ষতা বা চোখের নিচের কালচে দাগ শুধু অযত্নের ফল নয়; এটি শরীরের স্ট্রেস অ্যালার্ম।
নেপথ্যের কলকাঠি
মানসিক চাপ বা স্ট্রেস যখন গ্রাস করে, তখন শরীরের ভেতর একধরনের হরমোনজনিত যুদ্ধ শুরু হয়। প্রতিকূল পরিস্থিতি সামাল দিতে কর্টিসল নামক একটি হরমোন নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয় শরীর। এই হরমোন ত্বকের জন্য দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতিকর। পুরুষদের ত্বক সাধারণত নারীদের তুলনায় কিছুটা পুরু এবং এতে সেবাসিয়াস গ্রন্থি বেশি সক্রিয় থাকে। উচ্চ মাত্রার কর্টিসল এই গ্রন্থিগুলোকে উদ্দীপ্ত করে। ফলে ত্বকে অতিরিক্ত তেল বা সিবাম উৎপাদিত হয়। এই অতিরিক্ত তেল রোমকূপ বন্ধ করে; পরিণামে দেখা দেয় ব্রণ। এ ছাড়া কর্টিসল ত্বকের স্বাভাবিক সুরক্ষা স্তর বা ব্যারিয়ার ফাংশন দুর্বল করে ফেলে। ফলে ত্বক খুব দ্রুত সংবেদনশীল হয়ে পড়ে এবং যেকোনো ক্ষত শুকাতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় নেয়।
ঘুম ও ত্বকের সংযোগ
ঘুম শুধু চোখের বিশ্রাম নয়; শরীরের একটি প্রাকৃতিক রিসেট বাটনও। যখন আমরা গভীর ঘুমে থাকি, ত্বকে তখন রক্তসঞ্চালন বাড়ে। এই বাড়তি রক্তপ্রবাহ কোষগুলোতে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছে দেয়, যা সারা দিনের পরিবেশগত ক্ষতি; যেমন রোদ বা দূষণ কাটিয়ে উঠতে সহায়ক।
রাতে আমরা যখন ঘুমাই, শরীর তখন অনেকটা সার্ভিসিং মোডে চলে যায়। সারা দিনের ধকল শেষে ত্বক নিজেকে ভেতর থেকে সারিয়ে তোলার কাজ শুরু করে। কিন্তু যখনই পর্যাপ্ত ঘুম হয় না, এই মেরামতের কাজ মাঝপথে থমকে থাকে। ঘুমের অভাবে ত্বকের অন্যতম শক্তির উৎস কোলাজেন তৈরিতে ভাটা পড়ে। এই উপাদান অনেকটা স্প্রিংয়ের মতো কাজ করে, যা ত্বককে টানটান আর সতেজ রাখে।
পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব হলে ত্বক স্বাভাবিক আর্দ্রতা হারিয়ে পানিশূন্য বা ফ্যাকাশে দেখায়। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে চোখের নিচে। সেখানে জেঁকে বসে ডার্ক সার্কেল। এই অনিদ্রা যখন দীর্ঘদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়, তখন কপালে বা চোখের কোণে ফাইন লাইনস আর বলিরেখা উঁকি দিতে থাকে। সহজ কথায়, শরীরকে রিচার্জ হওয়ার পর্যাপ্ত সময় দেওয়া না হলে অকালেই চেহারা থেকে তারুণ্যের উজ্জ্বলতা হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি প্রবল।
স্ট্রেস ভার্সেস স্কিন
মানসিক চাপ ও ঘুমের অভাব পুরুষদের ত্বকে যে ধরনের দৃশ্যমান পরিবর্তন আনে, তা শুধু ফেসওয়াশ দিয়ে দূর করা সম্ভব নয়। এর প্রভাবগুলো জেনে রাখা ভালো।
 ব্রণের প্রাদুর্ভাব: অতিরিক্ত তেলের কারণে কপাল, গাল ও চিবুকে ব্যথাযুক্ত ব্রণ দেখা দেয়।
 অনুজ্জ্বলতা: মানসিক চাপের কারণে রক্তসঞ্চালন কমে যাওয়ায় ত্বক স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা হারায় এবং ফ্যাকাশে দেখায়।
 খসখসে ভাব: প্রদাহের কারণে ত্বকের কোষের স্বাভাবিক পরিবর্তন প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়; ফলে ত্বক পুরু ও অমসৃণ হয়ে পড়ে।
 হাইপারপিগমেন্টেশন: হরমোনের পরিবর্তনের কারণে ত্বকের নির্দিষ্ট কিছু স্থানে কালচে ছোপ বা প্যাচ তৈরি হতে পারে।
 ইলাস্টিন লস: দীর্ঘমেয়াদি চাপে ত্বকের ইলাস্টিন উপাদানটি ভেঙে যায়; ফলে ত্বক ঝুলে পড়ে এবং চেহারায় বার্ধক্যের ছাপ আসে।
লাইফস্টাইল ও স্কিন কেয়ার
সঠিক যত্নে ত্বকের ধরন বুঝে নিয়মিত ভালো মানের স্কিন কেয়ার প্রোডাক্ট ব্যবহার এবং লাইফস্টাইলে পরিবর্তন আনা উপকারী। প্রতিদিনের কিছু ছোট অভ্যাস ত্বকে আমূল পরিবর্তন এনে দিতে পারে। একজন পুরুষের স্কিন কেয়ার রুটিনে অন্তত চারটি ধাপ থাকা শ্রেয়।
 ক্লিনজিং: দিনে দুবার; কিন্তু ত্বক শুষ্ক হলে একবার প্রয়োগই উত্তম। একটি ভালো ক্লিনজার দিয়ে মুখ পরিষ্কার করা, যা ত্বককে শুষ্ক না করেই অতিরিক্ত তেল দূর করবে।
 অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সেরাম: এটি মানসিক চাপের ফলে সৃষ্ট ফ্রি-র‌্যাডিক্যালের বিরুদ্ধে লড়াই করে ত্বককে সুরক্ষা দেয়। এ ছাড়া ত্বকের ক্লান্তিভাব, হাইপারপিগমেন্টেশন ও ফাইন লাইনস কমাতে সহায়ক।
 ময়শ্চারাইজার: ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে এবং ব্যারিয়ার রিপেয়ারে সাহায্য করে।
 সানস্ক্রিন: এর কোনো বিকল্প নেই। প্রতিদিন ব্যবহার করা শ্রেয়। সূর্যের আলোর অতিবেগুনি রশ্মি ত্বকের প্রধান শত্রু। শুনতে অবাক লাগলেও সত্যি হলো, এটি মানসিক চাপজনিত প্রদাহ আরও বাড়িয়ে দেয়; তাই বাইরে বের হওয়ার আগে সানস্ক্রিন ব্যবহার মাস্ট।
এর পাশাপাশি মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত ব্যায়াম, ধ্যান এবং প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ ত্বকের ভেতর থেকে সজীবতা ফিরিয়ে আনে।
মানসিক চাপে ক্ষতিগ্রস্ত ত্বক সাধারণ রুটিনে সব সময় ঠিক হয় না। এ ক্ষেত্রে ডার্মাটোলজিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী কিছু উন্নত চিকিৎসা অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে।
 কেমিক্যাল পিলিং: এটি ত্বকের ওপরের মৃত কোষের স্তর সরিয়ে দেয় এবং রোমকূপ পরিষ্কার করে। ব্রণের দাগ দূরীকরণ এবং ত্বকের বুনট মসৃণ করতেও ম্যাজিকের মতো কাজ করে।
 মাইক্রোনিডলিং ও আরএফ থেরাপি: রেডিও ফ্রিকোয়েন্সিসহ মাইক্রোনিডলিং পুরুষদের গভীরতর ত্বকের সমস্যা সমাধানে সেরা। এই ট্রিটমেন্ট নতুন কোলাজেন তৈরি করে ঝুলে যাওয়া ত্বককে টানটান এবং বড় লোমকূপ ছোট করতে সহায়ক।
 লেজার রিসারফেসিং: দীর্ঘদিনের পিগমেন্টেশন বা কালচে ছোপ দূর করতে লেজার চিকিৎসা অতুলনীয়। এটি ত্বকের গভীরে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু মেরামত করে।
 হাইড্রেটিং ফেশিয়াল: ক্লিনিক্যাল ফেশিয়ালগুলো ত্বকের প্রদাহ কমায় এবং হারিয়ে যাওয়া আর্দ্রতা ফিরিয়ে আনে, যা অনেক সময় স্কিন কেয়ার প্রোডাক্টে সম্ভব নয়।
আত্মবিশ্বাসের বড় অংশ জুড়ে থাকে সতেজ ও প্রাণবন্ত চেহারা। তাই ক্যারিয়ারের চাপ কিংবা অন্যান্য ব্যস্ততার পাশাপাশি নিজের শরীরের স্ট্রেস অ্যালার্মগুলোকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। ব্যালেন্সড লাইফস্টাইল, স্কিন কেয়ার আর প্রয়োজনে ট্রিটমেন্ট—এই তিনের সমন্বয়ই পারে ত্বকের হারানো উজ্জ্বলতা ফিরিয়ে দিতে।

মডেল: আরহাম
মেকওভার: পারসোনা মেনজ
ছবি: জিয়া উদ্দীন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top