ফরহিম I ক্লাব ফোর থার্টি এএম
লেইট নাইট-আর্লি মর্নিং, বহুদিন ছিল দারুণ জনপ্রিয়। ঘুমকে যাচ্ছেতাইভাবে করা হয়েছে অবমূল্যায়ন। সেখানে এসেছে পরিবর্তন। সকাল তো নয়, এবার দিন শুরু হচ্ছে তারও আগে। ভোররাতে। ছোটবেলায় পড়ে আসা ‘আর্লি টু বেড, আর্লি টু রাইজ’ এবার চোখ রাঙাচ্ছে
ব্যস্ততার কারণে দিনরাত ২৪ ঘণ্টাও যথেষ্ট মনে হয় না। হবেই-বা কী করে! কিন্তু সবার জন্য সময় তো একই বরাদ্দ। তাই সব কাজ সারা চাই সেই অভিন্ন সময় ঘিরে। এ ক্ষেত্রে একটু চালাকি করে সময়টাকে নিজের মতো চালিয়ে নিতে পারলেই হলো; দরকার একটু ত্যাগ আর অধ্যবসায়।
আপাতদৃষ্টে সহজ মনে হলেও এতটা কিন্তু নয়! কথা হচ্ছিল ভোর সাড়ে চারটার সভাসদদের নিয়ে। পাশ্চাত্যে ব্যাপকভাবে সাড়া জাগিয়ে দেশের তরুণ থেকে প্রাপ্তবয়স্ক—সবার ওপরই প্রভাব ফেলছেন এই ফোর থার্টি এএমের মেম্বাররা। যাদের দৈনন্দিন কাজের জন্য ২৪ ঘণ্টা যথেষ্ট নয় কিংবা যারা নিজের দিনটাকে আরেকটু গুছিয়ে নিয়ে থাকতে চান পরিপাটি, তাদের জন্য এই ক্লাব হতে পারে সময়োপযোগী সমাধান।
ঘুম ভেঙে গেল বলেই কাজ শুরু করলাম, ভালো অভ্যাস নয়; সচেতনভাবে নিজেকে তৈরি করা জরুরি। সঙ্গে থাকতে পারে ছোট্ট শর্ট টাইম একটি গোল, যাকে কেন্দ্র করে এই অভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব। যাদের আগেভাগে ওঠার অভ্যাস, তারা ভালো করেই জানেন, পুরো দিন কেমন যাবে, সকাল সেই পূর্বাভাস দেয়। তাই সময়টা হওয়া চাই একান্তই আপনার। শুধু একটি অভ্যাস নয়, জীবনকাঠামোকে ঘুরিয়ে দিতে চাইলে নিশ্চিন্তে হয়ে যেতে পারেন ফোর থার্টি এএম ক্লাবের গর্বিত মেম্বার!
নতুনদের জন্য তিন টিপস
প্রথম দিনই ভোর সাড়ে চারটায় উঠতে হবে, এমন নয়; শুরুটা করতে পারেন প্রতিদিন ১০ মিনিট করে আগে ওঠার মাধ্যমে। কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে এক দিনেই নয়, নিজেকে চ্যালেঞ্জ নিতে অভ্যস্ত করুন বারেবারে।
অ্যালার্মের স্নুজ বাটনের কথা ভুলে যান। অ্যালার্ম বাজার সঙ্গে সঙ্গে বিছানা ছাড়ার অভ্যাস গড়া চাই। এতে শরীরে আসতে পারে চাঙা ভাব।
সকালের স্নিগ্ধ রোদ চোখে লাগুক ১০-১৫ মিনিট। সার্কাডিয়ান রিদমের জন্য এটি খুব জরুরি।
চারপাশ যখন ঘুমিয়ে, আলো ফোটেনি ঠিকভাবে, অভ্যাসের কারণে আপনি মেলে দিলেন চোখের পাতা। ফোর থার্টি এএম ক্লাবের মেম্বাররা এই সময়কে ব্যবহার করেন প্রকৃতির সঙ্গে নিজের সম্পর্ক আরও দৃঢ়ভাবে জোড়া দিতে। সময় নিয়ে যাদের ভীষণ আক্ষেপ, তাদের জন্য এটি হতে পারে নতুন একটা শুরু। নিজের সঙ্গে নিজের একটি ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইলে প্রাধান্য দেওয়া চাই নিজেকে। শাওয়ার আর গ্রুমিং থাকতে পারে এবারে। মাইল্ড বডি ওয়াশ, জেন্টল শ্যাম্পু, বিয়ার্ড ট্রিমিং জায়গা পাক এই পর্বে। তারপর অ্যালকোহল ফ্রি ডিওডোরেন্ট, ফেস সেরাম আর সানস্ক্রিনে তৈরি ত্বক। বের হওয়ার আগে ম্যাট হেয়ার ক্রিম অথবা লাইট পমেডে হেয়ার ডু ডান। উদি অথবা সিট্রাস পারফিউম জুতসই।
সারা দিনের দায়িত্বভারগুলো কিছুটা দূরে রেখে নিজেকে আপন করে নিতে পারেন। নিজের চাওয়া-পাওয়া, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে করতে পারেন জার্নালিং। দিনের শুরুতে এই চর্চা নিজের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে যেমন সাহায্য করবে, তেমনি আপনার পুরো দিনের প্রস্তুতিও নির্ধারণ করে দেবে। তবে এ ক্ষেত্রে মনোযোগ দেওয়া চাই, সকালে ওঠা মানেই কাজের অগ্রগতি নয়; বরং নিজেকে আরেকটু বেশি চেনার সময় পাওয়া। আগের দিনের কিংবা ঘুমের সময় জমে থাকা সব টক্সিন দূর করতে চাইলে ঘুম থেকে ওঠার পরপরই গড়ে তুলতে পারেন ঈষদুষ্ণ পানি পানের অভ্যাস। লিম্ফেটিক সিস্টেম সচল করতে এই অভ্যাস ম্যাজিকের মতো কাজ করে। যেহেতু শরীরে স্বাভাবিকভাবে সকালে কর্টিসলের মাত্রা বেশি থাকে, তাই এই অভ্যাস ইমিউনিটি বাড়াতেও সহায়ক। এ সময় যেকোনো ধরনের ক্যাফেইন জাতীয় পানীয় এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক।
‘কাল সকাল থেকেই জিমে যাব’ বলে যারা ফেলে রেখেছেন, হতে পারে এটিই মোটিভেশন কল। সময়ের অভাব কিংবা আলসেমিতে যদি সুস্থতা ধরে রাখার ইচ্ছা নষ্ট হয়ে যায়, তবে শেষবারের মতো ট্রাই করতে পারেন ভোরে ঘুম থেকে ওঠার মাধ্যমে। সকালের ব্যক্তিগত হাইজিন শেষে লেগে যেতে পারেন স্ট্রেচিং, মেডিটেটিং আর লাইট ওয়েট এক্সারসাইজে। কেননা, খুব সকালে মাথায় কাজের চিন্তা চাপতে পারে না বলে ওয়ার্কআউটে মনোনিবেশ করা যায় সহজে।
নিজের প্রতি ভালোবাসা জাহিরের সহজ পন্থা হলো নিজের কাজগুলো সেরে ফেলা। প্রথমবার শুরুটা হতে পারে নিজের বিছানা গোছানোর মাধ্যমে। যাদের ওভারথিংকিংয়ের অভ্যাস আছে, তাদের জন্য এটি একটি টোটকা। সাইকোলজিস্টদের মতে, যারা দিনের শুরুর দিকে গুছিয়ে কাজ করতে পারেন, তাদের জন্য দিনটি এমনিতেই গোছানো হয়ে যায়।
কোনো ব্যবসা শুরু, বই লেখা কিংবা প্রকল্প থেকে বাড়তি উপার্জনের ভাবনা আসছে? এই তো সময়, কাজে লাগাতে পারেন ফোর থার্টি এএমের অ্যাকটিভিটি। সময়টা যেহেতু শুধুই তখন আপনার, তাই দেরি না করে লেগে পড়তে পারেন কার্যসিদ্ধিতে।
পেন্ডিং ওয়ার্ক নয়; বরং সময়টা হোক শুধুই নিজের জন্য কিছু করার, যাকে বলে ডিপ ওয়ার্ক। মন থাকবে কাজের দিকে, আউটপুট হবে একদম এক শতে এক শ! ভোরের সময় কাটিয়ে যদি সকালে পৌঁছেই যান, তবে এ সময় নিজেকে একটু বাহবা দিতে পারেন। এবার পালা সেরা একটি সকালের নাশতার। এরপরের ধাপগুলো হতে পারে গতানুগতিক বা শুধু নিজের মতো কাস্টমাইজ করা। ক্ষতি নেই, যেখানে বেশির ভাগ মানুষের দিন মাত্র শুরু হচ্ছে, আপনার দিনের প্রস্তুতি তো শেষ। চাইলেই গুছিয়ে বেরিয়ে যেতে পারেন সুখের সন্ধানে।
কোনো অভ্যাস গড়ে উঠতে ২১ দিনের মতো সময় লাগে, আর তা লাইফস্টাইলে পরিণত হতে লাগে প্রায় ৩ মাস। সময়টা অনেক বেশি শোনালেও নিজেকে এক মাসের ছোট্ট একটি টার্গেট দিয়ে দেখতে পারেন। অর্জনের ঝুলি যদি ভারী হয়, তবে বয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে অনেক দূর। ছোট গোলগুলোই বড় বড় মাইলফলকে পরিণত হয়; তাই দেরি না করে নিজেকে ভালোবাসার সুযোগ দিতে পারেন ছোট্ট একটি অভ্যাস পরিবর্তনে।
বিদিশা শরাফ
মডেল: সায়েম
মেকওভার: পারসোনা মেনজ
ছবি: জিয়া উদ্দীন
