দৃশ্যভাষ্য I নিদারুণ নিশ্চিহ্ন
নর্দান হোয়াইট রাইনো। পৃথিবীর বুকে কোটি কোটি বছরের বিচরণ যে প্রাণীর, তার বিলুপ্তি দোরগোড়ায়। মানুষের লালসার কারণেই। এ প্রজাতির শেষ পুরুষ প্রাণীটির মৃত্যুর আগমুহূর্তের এই আলোকচিত্র
পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার ক্ষণে উপস্থিত একটি প্রাণী প্রজাতি। নর্দান হোয়াইট রাইনো। সরল বাংলায় উত্তরাঞ্চলীয় শ্বেত গন্ডার। ২০১৮ সালের মার্চে, কেনিয়ার ওল পেজেটা কনজারভেন্সিতে মুমূর্ষু অবস্থায় থাকা এ প্রজাতির সর্বশেষ এই পুরুষ প্রাণীর নাম সুদান। ওকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন পশুচিকিৎসক দলের সদস্য জোসেফ ওয়াচিরা। ছবিটি আমেরিকান আলোকচিত্র সাংবাদিক অ্যামি ভিটালের তোলা।
ওর মৃত্যুর পরপর মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএনে প্রকাশিত হয় প্রজাতিটি ঘিরে এক দীর্ঘ আলোকচিত্র প্রতিবেদন। ‘দ্য লাইফ হি লিভড: ফটোস অব দ্য লাস্ট মেল নর্দান হোয়াইট রাইনো’ শিরোনামে। আরও বেশ কিছু ছবির সঙ্গে আলোচ্য আলোকচিত্রও সেখানেই প্রথম প্রকাশ পায়।
প্রতিবেদনসূত্রে জানা যায়, সুদান মারা যায় ১৯ মার্চ ২০১৮, সোমবার। বয়স হয়েছিল ৪৫। মোটামুটি এ রকমই গড় আয়ু এ প্রাণীর। বার্ধক্যের কারণে স্বাস্থ্যের মারাত্মক অবনতি ঘটেছিল। সুস্থ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা ছিল না বলে, সুদানকে শান্তিতে মৃত্যুর ব্যবস্থা করে দিয়েছিল একটি পশুচিকিৎসক দল। সে সময়ে নিজের এই ‘পুরোনো বন্ধু’কে শেষ বিদায় জানাতে হাজির হয়েছিলেন অ্যামি। সিএনএনকে তিনি বলেন, ‘কাল (সোমবার) আমার মন ভেঙে গেছে; তবে ওকে বিদায় বলতে পেরে একটু স্বস্তিও লাগছে। মৃত্যুর সময় সে তার মাথা আমার দিকে ঝুঁকিয়ে রেখেছিল।’ যেন প্রকৃতিও কাঁদছিল ওর মৃত্যুতে। অ্যামির বয়ানে মেলে সেই সাক্ষ্য, ‘মুষলধারে বৃষ্টি ঝরছিল তখন। ঠিক সেদিনের মতোই, নয় বছর আগে যখন ওকে প্রথমবার আনা হয়েছিল এখানে।’
সুদানের সঙ্গে অ্যামির প্রথম সাক্ষাৎ ২০০৯ সালে। ওর পাশাপাশি আরও তিনটি উত্তরাঞ্চলীয় শ্বেত গন্ডারকে কেনিয়ায় আনা হয়েছিল চেক রিপাবলিকের একটি চিড়িয়াখানা থেকে। কেননা, ওরাই ছিল ওই প্রজাতির শেষ প্রতিনিধি। চোরাশিকারিদের দৌরাত্ম্যে প্রজাতিটির প্রাণী সংখ্যা কমে যাচ্ছিল বলে টিকিয়ে রাখার শেষ প্রয়াস হিসেবে ওই সংরক্ষণ কেন্দ্রে আনা। বলা বাহুল্য, ‘আপনা মাসে হরিণা বৈরী’ প্রবাদের মতোই, নিজেদের শিং এই প্রাণীর জীবনের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছিল। শিংয়ের লোভে শিকারিরা নির্বিচারে মেরে ফেলছিল ওদের।
কনজারভেন্সির নিবেদিতপ্রাণ কর্মীরা এই প্রাণী চারটির ওপর নিরন্তর নজর রাখতেন এবং এগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেন। আশা ছিল, কেনিয়ার বন্য পরিবেশ এবং বিচরণের বাড়তি পরিসর হয়তো ওদের প্রজননক্ষমতা সক্রিয় করবে; যার মাধ্যমে প্রজাতিটির টিকে থাকা সম্ভব হবে। কিন্তু আয়ুষ্কাল যখন ফুরিয়ে গেল সুদানের, তারপর এ প্রজাতির শুধু দুটি গন্ডারই টিকে রইল দুনিয়ায়। ওর কন্যা ও ওর নাতনি; যাদের নাম রাখা হয়েছে যথাক্রমে নাজিন ও ফাতু। তার মানে, সুদানের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেল এ প্রজাতির পুরুষ গন্ডারের।
‘ওর যারা দেখভাল করতেন, তাদের জন্য এ ঘটনা সত্যি অসহনীয় ছিল। তারা ওর প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন। তাদের কাছ থেকে জানলাম, প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে তারা নিজেদের সন্তানদের মুখ দেখার আগে এই গন্ডারগুলো দেখতে আসতেন। তারা বলেছেন, ওরা তো আমাদেরই সন্তান’, বলেন অ্যামি, যিনি কনজারভেশন ইন্টারন্যাশনালের ২০২৩/২০২৪ লুই-ওয়াল্টন ইনোভেটরস ফেলো হিসেবেও কাজ করছেন।
অ্যামির মতে, ভীষণ ‘কোমল হৃদয়ের’ প্রাণী ছিল সুদান। ভীষণ আদরকাড়া। একজন পশুচিকিৎসক তো ওকে সুইটি-পাই নামে ডাকতেন। স্মৃতিচারণায় ডুব দিয়ে এই আলোকচিত্রী আরও বলেন, ‘ওকে যখন প্রথমবার আফ্রিকায় ফিরিয়ে আনা হয়, সেদিন ছিল মুষলধারায় বৃষ্টি। আফ্রিকার কাদামাটিতে সেদিনের সেই তরুণ সুদান কেন এমন আহ্লাদ করে গড়াগড়ি খাচ্ছিল, আমি ঠিকই বুঝতে পেরেছিলাম। নিজের উৎসের সঙ্গে ওর পুনঃসংযোগ গড়া দেখতে পাওয়া আমার কাছে ছিল এক মনোরম দৃশ্য। এদিকে, গতকাল যখন বৃষ্টি নামল, তখনো জ্ঞান আছে ওর। মাটিতে শুয়ে থেকে মাথাটা একটু ওঠাতে চাচ্ছিল। আর, যখন মরে গেল, শুধু একটি ছোট্ট পাখির একটানা ডাকাডাকি ছাড়া বাকি সব ছিল পিনপতন নীরবতায় ঢাকা। পাখিটি যেন গাইছিল, “চলে যাও, চলে যাও, চলে যাও…” ।’
পুরুষ প্রজাতির বিলুপ্তিতে পৃথিবীর বুকে উত্তরাঞ্চলীয় শ্বেত গন্ডার প্রাকৃতিকভাবে একেবারেই নিশ্চিহ্ন হওয়া সময়ের ব্যাপারমাত্র, এমন শঙ্কা থাকলেও বিজ্ঞানীরা কিছু আশার আলো দেখছেন। সুদানের জিনগত উপাদান সংরক্ষণ করে রেখেছেন তারা। আশা রাখছেন, কৃত্রিম প্রজননপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এই প্রজাতিকে ফিরিয়ে আনতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে একটি দক্ষিণাঞ্চলীয় শ্বেত গন্ডারকে সারোগেট মাদার হিসেবে ব্যবহারের চিন্তা তাদের, এমনটাই জানিয়েছেন অ্যামি; তবে সফল হওয়ার নিশ্চয়তা নেই। প্রাণিবিজ্ঞানীরা যদি ব্যর্থও হন, সুদানের মৃত্যু তবু একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার রেখে যেতে সক্ষম। ‘সুদান আসলে সেই সব বহুসংখ্যক প্রজাতির একজন অ্যাম্বাসেডর, যেগুলোকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করায় আমাদের মনোযোগ প্রয়োজন,’ বলেছেন অ্যামি। তাই এই মৃত্যুকে একটি প্রবল রকমের সচেতনতার আহ্বান হিসেবে গণ্য করা উচিত বলে অভিমত তার।
২০০৮ সাল থেকে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিনের হয়ে ছবি তুলছেন অ্যামি। নিজের ক্যারিয়ারের গতিপথ ইতিবাচকভাবে পাল্টে দেওয়ার কৃতিত্ব এই গন্ডারগুলোকেই দেন। ক্যারিয়ারের প্রথম দশকে তিনি দুনিয়াজুড়ে ঘটে যাওয়া সহিংসতাগুলোর ছবি তুলতেন। এরপর ২০০৯ সালে এই গন্ডারগুলোর গল্প শুনতে পান। স্মৃতিচারণায় বলেন, ‘জীবনে প্রথম যখন এই প্রাচীন, নম্র, জবুথবু প্রাণীগুলোর দেখা পেলাম, আমার অন্তর সিক্ত হয়ে গেল। বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, এই প্রজাতি কীভাবে কোটি কোটি বছর ধরে টিকে আছে।’ ফলে আলোকচিত্রের বিষয়বস্তু বদলে নেন তিনি। তারপর থেকে নানা প্রাণীর ছবি তুলছেন এবং সেগুলো নিয়ে কাজ করছেন। বললেন, ‘৮০০ কোটির বেশি মানুষের এই পৃথিবীতে আমাদের অবশ্যই নিজেদের ল্যান্ডস্কেপের অংশ হিসেবে দেখা উচিত। আমাদের নিয়তি আদতে প্রাণীগুলোর নিয়তির সঙ্গে বাঁধা। … আমরা ভীষণভাবে পরস্পর সংযুক্ত। কোনো একটি প্রজাতিকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা মানে আকাশ থেকে পাতাল—সবকিছু উলটপালট করে দেওয়া।’
লাইফস্টাইল ডেস্ক
