skip to Main Content
স্মরণে সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী

ইতিহাসে এমন কিছু মানুষের আগমন ঘটে, যাদের ব্যাপ্তি কেবল তাদের অর্জিত সম্পদে নয়; বরং তাদের স্পর্শ করা অগণিত জীবনের মাঝে নিহিত থাকে। বিশ্বজুড়ে অনেক সফল ব্যক্তিত্ব যেমন ব্যবসার পাশাপাশি মানবকল্যাণে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, বাংলাদেশের শিল্প ও সামাজিক উন্নয়ন জগতের প্রেক্ষাপটে সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী ছিলেন ঠিক তেমনই এক অবিস্মরণীয় নাম। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানিয়েছে এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেড।

আরও বলা হয়, একজন সফল দূরদর্শী উদ্যোক্তা হয়েও তিনি ছিলেন শেকড়ের কাছাকাছি থাকা অত্যন্ত সাধারণ ও বিনয়ী মানুষ। প্রয়াণের এক বছর পর, আমরা কেবল একজন সফল ব্যক্তিকেই স্মরণ করছি না; স্মরণ করছি এক পিতৃতুল্য অভিভাবককে, যার কাছে সবচেয়ে বড় প্রাধান্য ছিল মানুষ।

তার জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে মিশে ছিল গভীর মানবিকতা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং প্রবল দেশপ্রেম। তার জীবনদর্শন ছিল অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও অনুকরণীয়; ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি বা সামাজিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি কেবল একটি পরিচয়েই বিশ্বাস করতেন, আর তা হলো ‘মানুষ’। তার প্রতিটি কাজের মূলমন্ত্র ছিল, ‘সবার আগে দেশ এবং দেশের মানুষ।’ শুধু কথায় নয়, যেকোনো ব্যবসায়িক উদ্যোগ, বিনিয়োগ বা জাতীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তিনি সবার আগে ভাবতেন, এতে দেশের সাধারণ মানুষের কতটা কল্যাণ হবে, কতগুলো নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং দেশের অর্থনীতি কতটা শক্তিশালী হবে। নিজের লাভের চেয়ে দেশের কল্যাণই তার কাছে সব সময় অগ্রাধিকার পেত।

১৯৭০ সালে এপেক্স ট্যানারির সঙ্গে তার যে যাত্রার সূচনা হয়েছিল, তা কেবল একটি ব্যবসায়িক সফলতার গল্প ছিল না; বরং তা ছিল হাজারো মানুষের জন্য এক নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তোলার গল্প। প্রতিষ্ঠানের ফ্যাক্টরির ফ্লোর থেকে শীর্ষ স্থানীয় পর্যায়– সবখানেই তিনি ছিলেন সকলের এক পরম নির্ভরতার জায়গা। প্রচলিত করপোরেট কাঠামোর কঠোর নিয়মকানুন ও দূরত্বের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি কর্মীদের কাছে হয়ে উঠেছিলেন সত্যিকারের অভিভাবক।

একজন মহানুভব ব্যক্তি হিসেবে সরাসরি মানুষের জীবনে তার প্রভাব ছিল অতুলনীয়। প্রাতিষ্ঠানিক অনুদানের বাইরেও তার ব্যক্তিগত সহায়তা ছিল সম্পূর্ণ প্রচারবিমুখ। কর্মীদের পারিবারিক চিঠির উত্তর দেওয়া থেকে শুরু করে অসংখ্য শিক্ষার্থীর শিক্ষার ব্যবস্থা করা, তরুণদের স্বাবলম্বী করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া এবং অসুস্থ মানুষের চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করা– এসবই ছিল তার দৈনন্দিন জীবনের অংশ।

এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে তিনি ‘মেড ইন বাংলাদেশ’কে বিশ্বদরবারে এক অনন্য সম্মান এনে দিয়েছেন। পাশাপাশি, ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থেকে দেশের শিক্ষা, গবেষণা ও নীতি-নির্ধারণী খাতেও রেখেছেন অসামান্য অবদান। তবে তার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোকে কেবল পরিসংখ্যানের মাপকাঠিতে বিচার করা যায় না; বরং তা লুকিয়ে আছে তার গভীর সততা ও নীতিবোধের মাঝে। এর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দাম আকস্মিকভাবে বেড়ে যাওয়ার পরও, নিশ্চিত লোকসান জেনেও তিনি পুরনো চুক্তিতেই বিদেশি ক্রেতাদের পণ্য সরবরাহ করেছিলেন। তার সেই অবিচল সিদ্ধান্ত প্রমাণ করেছিল, ‘সাময়িক লাভের চেয়ে মানুষকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির মূল্য অনেক বেশি।’

তরুণ উদ্যোক্তাদের তিনি সর্বদা বলতেন, ‘যে সাফল্য মানুষের মনে আত্মতৃপ্তি ও শান্তি দেয় না, তা চরম ব্যর্থতা।’ তিনি কেবল কথায় নয়, কাজেও হাজারোবার এই দেশের মানুষদের প্রমাণ করেছেন প্রকৃত মেন্টরশিপ কাকে বলে। একজন সফল ব্যবসায়ীর গণ্ডি পেরিয়ে তিনি রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক খাতেও রেখেছেন অসামান্য অবদান। দেশের ক্রান্তিলগ্নে ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে দুবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি প্রমাণ করেছেন দেশের প্রতি তার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা।

২০২৫ সালের ১২ মার্চ তার বিদায়বেলায় সমাজের সর্বস্তরের মানুষের ব্যথিত হৃদয়ের অনুভূতি প্রমাণ করেছিল, তিনি কেবল সম্পদ বা সাফল্য নয়, জয় করেছিলেন অগণিত মানুষের হৃদয়। জীবনের সার্থকতা কেবল সম্পদ জমানোর মাঝে নয়; বরং দেশ ও মানুষের কল্যাণে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার মাঝেই নিহিত– এই শিক্ষাই তার রেখে যাওয়া সবচেয়ে বড় উপহার।

  • ক্যানভাস অনলাইন
    ছবি: এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেড-এর সৌজন্যে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top